কর ছাড়কেন্দ্রিক বাজেট পরিবর্তনের ইঙ্গিত

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ঘিরে দেশের রাজস্বনীতি ও কর কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয়তাবাদী দল-সমর্থিত সরকারের প্রথম বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ও চাপ থাকা সত্ত্বেও এবার মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতকে আরও গতিশীল করা।

অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতির চাপ বিবেচনায় রেখেও কর অব্যাহতি কমানোর পরিবর্তে কিছু খাতে নতুন কর ছাড় দেওয়ার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পকে উৎসাহিত করতে একাধিক প্রণোদনা প্যাকেজ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে চাল, গম, আলু, মসলা ও অন্যান্য প্রায় ষাটটি পণ্যের ওপর উৎসে কর দশমিক পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, যাতে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ শতাংশ করস্তর বাতিলের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর করের বোঝা হ্রাস করবে।

শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। অন্যদিকে মুক্তপেশাজীবী ও ডিজিটাল কনটেন্ট সৃষ্টিকারীদের আয়ের ওপর পূর্ণ কর অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি কর অব্যাহতি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব যানবাহন, বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ও বাস ব্যবহারে কর সুবিধা এবং নিবন্ধন কর হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতেও বড় ধরনের কর সুবিধা আসতে পারে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হৃদযন্ত্রে ব্যবহৃত স্টেন্ট, চোখের লেন্সসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণ আমদানিতে কর ও মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের ওপরও শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে।

ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বার্ষিক পঞ্চাশ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সত্তর লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে কর অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো—

খাতপ্রস্তাবিত পরিবর্তন
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যপ্রায় ৬০টি পণ্যে উৎসে কর দশমিক ৫ শতাংশে নামানো
আয়কর সীমাচার লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়
মুক্তপেশা ও ডিজিটাল কনটেন্টসম্পূর্ণ কর অব্যাহতি
পরিবেশবান্ধব যানবাহননিবন্ধন কর হ্রাস ও কর রেয়াত
সৌরবিদ্যুৎদীর্ঘমেয়াদি কর অব্যাহতি ও সুবিধা
ওষুধ কাঁচামালঅধিকাংশ ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যাহার
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত টার্নওভার
নারী উদ্যোক্তা৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত টার্নওভার

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হলো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। তবে একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ ও করছাড়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

Leave a Comment