ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন অর্থায়ন তহবিল ঘোষণা

দেশের কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫,০০০ কোটি টাকার একটি নতুন পুনরর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জারি করা একটি নীতিমালায় এই তথ্য জানানো হয়েছে। এই বিশেষ তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে বা মুনাফায় ঋণ বা অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে এই আবর্তনশীল তহবিলটি গঠন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা পরিচালিত হবে।

তহবিলের মেয়াদ ও মূল উদ্দেশ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বিশেষ ঋণ সুবিধাটি প্রাথমিকভাবে তিন বছর মেয়াদে চালু থাকবে। যেহেতু এটি একটি আবর্তনশীল তহবিল, তাই গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ পুনরায় নতুন ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে এই কর্মসূচিটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসায়ীদের সহায়তা দিতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার ও অর্থায়ন প্রক্রিয়া

তফসিলি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে এই পুনরর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে উদ্যোক্তা বা ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কোনোভাবেই ৯ শতাংশের বেশি সুদের হার আদায় করা যাবে না। ইসলামী ব্যাংকগুলোও তাদের নিজস্ব শরিয়াহ-ভিত্তিক অনুমোদিত অর্থায়ন কাঠামোর আওতায় এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে। এই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিদ্যমান ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত মাশুল বা কমিশন ব্যতীত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ওপর অন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ বা ফি আরোপ করতে পারবে না।

নিচে ছকের মাধ্যমে এই পুনরর্থায়ন তহবিলের সুদের হার এবং মৌলিক শর্তাবলি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

প্রধান বিষয়াবলিসুনির্দিষ্ট তথ্য ও শর্তসমূহ
তহবিলের মোট পরিমাণ৫,০০০ কোটি টাকা
প্রাথমিক পরিচালন মেয়াদ৩ বছর (আবর্তনশীল)
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর প্রাপ্তি হার৪ শতাংশ
গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার৯ শতাংশ
রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ড৩ থেকে ৬ মাস

ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতা ও শর্তাবলি

এই তহবিলের আওতায় কেবল সেইসব কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে, যারা চলতি মূলধনের অভাবে তাদের পূর্ণ উৎপাদন বা সেবা প্রদানের সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। যেসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই অন্য কোনো অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা ভোগ করছেন, তারাও ব্যাংকিং নিয়মকানুন এবং নির্ধারিত সীমা সাপেক্ষে এই তহবিল থেকে নতুন করে ঋণের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন।

তবে ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে এই নীতিমালায় কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ঋণ তথ্য ব্যুরোর তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন, তবে তারা এই তহবিলের আওতায় কোনোভাবেই ঋণ সুবিধা পাবেন না। সাধারণ গ্রাহকদের সুবিধার্থে এই ঋণের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা প্রদান করা হবে, যে সময়ে ঋণের মূল কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।

ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ ও অগ্রাধিকার নীতি

বাংলাদেশে কর্মরত সকল তফসিলি ব্যাংক এই পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে যেসব ব্যাংকের অগ্রিম-আমানত অনুপাত বা ঋণ-আমানত অনুপাত ৭০ শতাংশের বেশি রয়েছে, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই পুনরর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে। এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট’-এর সাথে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

ঋণ সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাংকগুলো প্রয়োজন মনে করলে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত জামানত বা সহায়ক জামানত গ্রহণ করতে পারবে। তবে বিতরণকৃত ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই ঋণ কর্মসূচি কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চলতি মূলধনের সংকট দূর করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

Leave a Comment