বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মোঃ খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাংকটি থেকে ৩,৫০০ কোটি টাকারও বেশি আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকেরা। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগের পর থেকেই টাকা তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা তীব্র রূপ ধারণ করেছে।
Table of Contents
আমানত প্রত্যাহারের পরিসংখ্যান ও পটভূমি
গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মোঃ খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বাধীন পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি ডেপুটি গভর্নরের পদ হারিয়েছিলেন। গত ১ জুন তার প্রথম কার্যদিবসে ব্যাংকটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার নিয়োগের বিরোধিতা করে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও গ্রাহকেরা ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে প্রধান কার্যালয়ের সামনে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি সশরীরে ব্যাংকে উপস্থিত হতে পারেননি এবং পূর্বনির্ধারিত পর্ষদ সভাও স্থগিত করতে হয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় এই পর্ষদ সভাটি অনলাইনে সম্পন্ন হয়, যেখানে তাকে চেয়ারম্যান এবং মোঃ আলতাফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। একই দিনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে সাবেক চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন।
ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম চার কার্যদিবসে (১ থেকে ৪ জুন) গ্রাহকেরা ২,৫৭ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। এর পরবর্তী কর্মদিবসে দেশের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে আরও প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে আমানত হ্রাসের এই চিত্রটি নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সময়কাল | উত্তোলিত আমানতের পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| প্রথম চার কার্যদিবস (১-৪ জুন) | ২,৫৭০ |
| পঞ্চম কার্যদিবস (আনুমানিক) | ১,০০০ |
| মোট পাঁচ কার্যদিবস | ৩,৫০০-এর অধিক |
ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য
ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন গ্রাহকদের এই টাকা তোলার চেষ্টার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে ভীতি থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে যেকোনো ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। গ্রাহকদের এই উদ্বেগ দূর করতে এবং বর্তমান সংকটের সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনকে তলব করে। সংকটের বিষয়ে গভর্নরের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে তিনি গত কর্মদিবসে বিকেল ৫টার দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উপস্থিত হন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রাহকেরা নগদ টাকা নিজেদের কাছে রাখার জন্য তুলছেন নাকি অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না—এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যদি কোনো তারল্য সংকট দেখা দেয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। এর আগেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটি সংকটে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিয়েছিল।
বিগত বছরের আমানত প্রবৃদ্ধি
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলে গ্রাহকদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ১.৮৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছিল ২২,০০০ কোটি টাকারও বেশি। সেই সময়ে আমানত উত্তোলনের চেয়ে নতুন আমানত জমার পরিমাণ বেশি থাকায় ব্যাংকের সার্বিক আমানতের ভিত্তিতে একটি বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে মাত্র পাঁচ দিনেই ব্যাংকটি প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে।
বিক্ষোভ কর্মসূচির বিস্তার
নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগের প্রতিবাদে এবং তার পদত্যাগের দাবিতে মতিঝিলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারী প্ল্যাটফর্মের সভাপতি নূর নবী মানিক নতুন চেয়ারম্যানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছেন। একই সাথে তিনি সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী দুই ঘণ্টার কলম বিরতি এবং অবস্থান ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
বিক্ষোভকারীরা আরও দাবি জানিয়েছেন যে, এস আলম গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের যে ৮২ শতাংশ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, তা বিক্রি করে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সমন্বয় করা হোক। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, বিতর্কিত বা কোনো ঋণখেলাপি এবং অভিযুক্ত পরিচালককে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে দেওয়া হবে না এবং খুরশিদ আলমকে কোনোভাবেই ব্যাংকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি
ইসলামী ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শাখা ব্যবস্থাপকেরা গ্রাহকদের টাকা তোলার দীর্ঘ লাইনের বিষয়ে এবং সার্বিক সংকট নিয়ে চেয়ারম্যানকে বারবার অবহিত করলেও সেখান থেকে কোনো কার্যকর দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়োগ অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মোঃ আলাউদ্দিন জানান, তাদের বিভাগের কাজ মূলত নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আমানত বা তারল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব অন্য বিভাগের। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা তোলার খবর তারা পেয়েছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে জানান।
এই সংকটটি এমন একটি সময়ে দৃশ্যমান হলো যখন দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংকের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে নগদ টাকা রাখার প্রবণতা সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে জনগণের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২৭৫,০০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষে এই পরিমাণ প্রায় ২৮,০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০৩,০০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
