বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভে আশাব্যঞ্জক গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে দেশের গ্রস রিজার্ভে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যুক্ত হয়েছে। গত ২২ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমানে রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে ২৮.০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি মাসের শুরুতে অর্থাৎ ১ ডিসেম্বরেও যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ছিল ২৬.৫১ বিলিয়ন ডলার, সেখানে তিন সপ্তাহের কম সময়ে এই বিশাল প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি বড় অর্জন।
রিজার্ভের এই দ্রুত উন্নতির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত ডলার ক্রয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি ‘বিপিএম-৬’ অনুসরণ করে এই রিজার্ভের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থবছরে এ পর্যন্ত বাজার থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্রয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা রিজার্ভের ভিত্তি মজবুত করতে সরাসরি সহায়তা করছে।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের বিনিময় হার যেন ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ করছে। বাজারে ডলারের যোগান বেশি থাকলে বিনিময় হার পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিলামের এই কৌশল কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
নিচে গত ২০ দিনের ব্যবধানে রিজার্ভের পরিবর্তনের একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হলো:
ডিসেম্বর মাসে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের সাম্প্রতিক অবস্থান
| বিবরণ | ১ ডিসেম্বর | ২২ ডিসেম্বর | পরিবর্তনের পরিমাণ |
| মোট গ্রস রিজার্ভ | ২৬.৫১ বিলিয়ন ডলার | ২৮.০৪ বিলিয়ন ডলার | ১.৫৩ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি |
| রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি | — | — | ৫.৭৭% বৃদ্ধি |
| বাজার থেকে ডলার ক্রয় | — | ২.৫ বিলিয়ন ডলার+ | চলতি অর্থবছরের হিসাব |
| প্রধান চালিকাশক্তি | আমদানি ব্যবস্থাপনা | রেমিট্যান্স প্রবাহ | বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিলাম |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল ও ঊর্ধ্বমুখী। ব্যাংকগুলোতে ডলারের তারল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকারকদের এলসি বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রেও জটিলতা কমেছে। বাজারে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় ব্যাংকগুলোও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করতে আগ্রহী হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে আরও বিশ্বস্ত করে তুলবে। তবে এই প্রবৃদ্ধির ধারা স্থায়ী করতে হলে রপ্তানি আয় সময়মতো প্রত্যাবাসন এবং হুন্ডি রোধে নজরদারি বজায় রাখা জরুরি। যদি বর্তমানের এই রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকে, তবে সামনের মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আরও সংহত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
