বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং আর্থিক সূচক উন্নয়নে ২০২৫ সালে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিগত এক বছরে তারা ৩,৫৮৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। খেলাপি ঋণ (NPL) হ্রাসের এই ইতিবাচক ধারা ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠনে বড় ধরণের ভূমিকা রাখছে।
Table of Contents
খেলাপি ঋণের চিত্র ও লক্ষ্যমাত্রা
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে অগ্রণী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২,০০২ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৪০.৪৯ শতাংশ। তবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে ২০২৫ সাল শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮,৬১৬ কোটি টাকায়। এর ফলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৩৫.৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাংকের বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০২৬ সালের মধ্যে এই হারকে ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।
এক নজরে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান আর্থিক সূচকসমূহ (২০২৪ বনাম ২০২৫):
| আর্থিক সূচক | ২০২৪ সাল (কোটি টাকা) | ২০২৫ সাল (কোটি টাকা) | পরিবর্তন (কোটি টাকা) |
| মোট খেলাপি ঋণ | ৩২,০০২ | ২৮,৬১৬ | -৩,৫৮৪ (হ্রাস) |
| খেলাপি ঋণের হার | ৪০.৪৯% | ৩৫.৫২% | -৪.৯৭% (হ্রাস) |
| মোট আমানত | ৯৯,২৩২ | ১১৩,০৬৪ | +১৩,৮৩২ (বৃদ্ধি) |
| মোট ঋণ ও অগ্রিম | ৭৯,০৩৭ | ৮০,৫৭৩ | +১,৫৩৬ (বৃদ্ধি) |
| পরিচালন মুনাফা | ১,৫১১ | ২,৫০২ | +৯৯১ (বৃদ্ধি) |
| সংগৃহীত রেমিট্যান্স | ২১,০৩৩ | ৩৩,৯৬১ | +১২,৯২৮ (বৃদ্ধি) |
রেকর্ড পরিচালন মুনাফা ও ঋণ আদায়
২০২৫ সালে অগ্রণী ব্যাংক তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। গত বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২,৫০২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৯৯১ কোটি টাকা বেশি। এই মুনাফা অর্জনের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে খেলাপি ঋণ থেকে রেকর্ড পরিমাণ আদায়। ২০২৪ সালে যেখানে খেলাপি ঋণ থেকে আদায় ছিল মাত্র ১,৭২৬ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০,২৩৪ কোটি টাকায়।
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, এই ১০,২৩৪ কোটি টাকার মধ্যে নগদ আদায় হয়েছে ১,০০৯ কোটি টাকা, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে আদায় ৮,৩৬৮ কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত (Written-off) ঋণ থেকে আদায় হয়েছে ৯৩৬ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬ সালের জন্য ব্যাংকটি ১২,২০০ কোটি টাকা আদায়ের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য
আমানত এবং ঋণ আদায়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। ২০২৫ সালে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে ৩৩,৯৬১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি। আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি ৫৪,৩৬৭ কোটি টাকার এলসি (LC) নিষ্পত্তি করেছে। তবে রপ্তানি বাণিজ্যে কিছুটা মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয়েছে; ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর রপ্তানি আয় ৮৬২ কোটি টাকা কমে ১৩,২৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক যোগদানের পর ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কার এবং ঋণ আদায়ে ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের মতো উদ্যোগগুলো এখন ফল দিতে শুরু করেছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যাংকটি ১১৩,০৬৪ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে, যা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অগ্রণী ব্যাংক আগামীতে দেশের ব্যাংকিং খাতের এক রোল মডেলে পরিণত হতে চায়।
