অর্থনীতিতে ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধি উদ্বেগ বাড়ছে

সরকারের সাম্প্রতিক ব্যাংক ঋণ গ্রহণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দেড় মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সামগ্রিকভাবে বাজেট ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব ঘাটতির চাপকে আরও তীব্র করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র দেড় মাসে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় একচল্লিশ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর আগের তিন মাস মিলিয়ে এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার কোটি টাকা। মূলত রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকায় সরকারি ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ স্থবির থাকা, কর্মসংস্থান কম বৃদ্ধি পাওয়া এবং ভোক্তা ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেছে। এর পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে, ফলে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।

একই সময়ে সরকারি ব্যয় হ্রাস না পাওয়ায় অর্থায়নের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ও বিভিন্ন উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে চলতি অর্থবছরের নয় মাসেই ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত প্রায় চৌদ্দ মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থনীতিবিদরা এটিকে সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, কারণ অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি করতে পারে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।

সরকারের ব্যাংক ঋণের সারসংক্ষেপ

সময়কালঋণের পরিমাণ (প্রায়)
দেড় মাস৪১ হাজার কোটি টাকা
তিন মাস (মোট)৫৬ হাজার কোটি টাকা
জানুয়ারি থেকে মার্চ৫৬ হাজার কোটি টাকা
নয় মাস (চলতি অর্থবছর)১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা
১৪ মাসে মোট বৃদ্ধিপ্রায় ১.৭৫ লাখ কোটি টাকা

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এভাবে ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি হলে ঋণ প্রবাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, বর্তমান প্রবণতা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

Leave a Comment