অ-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোও মোবাইল মানি চালাতে পারবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন খসড়া বিধিমালা ডিজিটাল আর্থিক খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে

ই-মানি ইস্যুকারীদের জন্য মূল শর্তাবলি:

  • ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন বজায় রাখা

  • তিন বছরের ব্যবসা ও ঝুঁকি পরিকল্পনা প্রস্তুত করা

  • গ্রাহকের অর্থ সংরক্ষণের জন্য সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট রাখতে হবে

  • প্রতিনিয়ত জালিয়াতি শনাক্তকরণ কার্যক্রম চালু রাখতে হবে

  • সুশাসন ও উচ্চ সততার পরিচালক নিয়োগ বাধ্যতামূলক

  • পরিচালনা পর্ষদে অডিট ও ঝুঁকি কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক

  • বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা আইনি ব্যবস্থা

  • চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে অংশীজনদের মতামত গ্রহণ

  • বিদ্যমান অপারেটরদের কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে পুনরায় আবেদন করতে হবে

বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) এমন একটি খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করেছে, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো অ-বাণিজ্যিক (non-bank) দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোকে পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP) ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রদানকারী হিসেবে লাইসেন্স দেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশে ই-মানি ইস্যুকারী বিধিমালা’ খসড়াটি জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে, যা দীর্ঘদিনের ব্যাংক-নির্ভর ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা মডেল থেকে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় ব্যাংক এবং স্বতন্ত্র ডিজিটাল ফাইন্যান্স কোম্পানি উভয়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ই-মানি ইস্যু করতে পারবে।

বর্তমান এমএফএস ও পিএসপি অপারেটররা—ব্যাংক-নির্ভর বা অ-ব্যাংক উভয়ই—নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিকাশ, রকেট, নগদের মতো এমএফএস প্রদানকারীরা এবং ট্যালিপে, পাঠাও পে, শেবা পে’র মতো পিএসপিগুলো ই-মানি ইস্যু করে ডিজিটাল লেনদেন ও পেমেন্ট সেবা পরিচালনা করছে।

বিবি জানিয়েছে, এসব কার্যক্রমকে আইনি ও তত্ত্বাবধান কাঠামোর আওতায় আনতেই এ খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগত স্থিতিশীলতা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, নতুন বিধিমালার উদ্দেশ্য হলো “আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, ই-মানির নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন-চালিত পেমেন্ট পরিবেশ গড়ে তোলা।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক সংস্কার যা প্রচলিত ব্যাংক খাতের বাইরেও ডিজিটাল ফাইন্যান্স খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ কাঠামো চাই, যেখানে ব্যাংক ও ফিনটেক উভয়ই আর্থিক সেবার প্রসারে কাজ করতে পারবে।”

ফিনটেক শিল্পের নেতারা এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। এক শীর্ষ ফিনটেক নির্বাহী বলেন, “অ-ব্যাংক ইএমআই চালুর সুযোগ পেলে মোবাইল ও অনলাইন পেমেন্ট খাতে উদ্ভাবন ও অংশীদারিত্ব আরও দ্রুত বাড়বে।”

খসড়া বিধিমালার মূল দিক

প্রস্তাবিত কাঠামোয় ই-মানি ইস্যুকারীদের দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—
১. অনুমোদিত ইএমআই (Authorised EMI): ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলো।
২. নিবেদিত ইএমআই (Dedicated EMI বা DEMI): শুধুমাত্র ই-মানি ও সম্পর্কিত পেমেন্ট কার্যক্রমে জড়িত অ-ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিশেষ করে ডেমি-প্রার্থীদের ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন বজায় রাখতে হবে, তিন বছরের ব্যবসা ও ঝুঁকি পরিকল্পনা জমা দিতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষায় ট্রাস্ট ও সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ই-মানি ইস্যুকারীদের আরও একটি শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে হবে, নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে, বড় লেনদেনে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করতে হবে এবং ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রতারণা শনাক্তকরণ ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তারা যেন স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখে, উচ্চ সততার পরিচালক নিয়োগ দেয় এবং দায়িত্ব বণ্টনে কঠোরতা বজায় রাখে—এগুলোও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের অডিট ও ঝুঁকি কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক থাকবে যাতে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধান জোরদার হয়।

বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা দেওয়ানি ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে অংশীজনদের মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিধিমালা কার্যকর হলে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে—বিশেষ করে চীন, ভারত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ এবং ২০২৪ সালের পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইনের অধীনে ই-মানি ইস্যুকারীদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে।

Leave a Comment