দেশের অ-ব্যাংক আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার ভারে ন্যুব্জ ছয়টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) অবলুপ্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসাথে, ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য তিন মাসের বিশেষ সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভায় এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ এবং চরম মূলধন ঘাটতির কারণে বর্তমানে এক প্রকার ‘অকার্যকর’ অবস্থায় রয়েছে।
অবলুপ্তির তালিকায় থাকা ছয় প্রতিষ্ঠানের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অবলুপ্ত করা হচ্ছে সেগুলোর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের সিংহভাগই বর্তমানে খেলাপি এবং লোকসানের পাহাড় জমেছে। সবচেয়ে করুণ অবস্থা এফএএস ফাইন্যান্সের, যেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগ (৯৯.৯৩ শতাংশ)। এছাড়া পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং আভিভা ফাইন্যান্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানে ডুবে আছে।
নিচে অবলুপ্তির জন্য চূড়ান্ত হওয়া ছয়টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সূচক দেওয়া হলো:
| প্রতিষ্ঠানের নাম | খেলাপি ঋণের হার (%) | মোট লোকসানের পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| এফএএস ফাইন্যান্স (FAS Finance) | ৯৯.৯৩% | ১,৭১৯ |
| ফেয়ারইস্ট ফাইন্যান্স (Fareast Finance) | ৯৮.০০% | ১,০১৭ |
| ইন্টারন্যাশনাল লিজিং (International Leasing) | ৯৬.০০% | ৪,২১৯ |
| পিপলস লিজিং (People’s Leasing) | ৯৫.০০% | ৪,৬২৮ |
| আভিভা ফাইন্যান্স (Aviva Finance) | ৮৩.০০% | ৩,৮০৩ |
| প্রিমিয়ার লিজিং (Premier Leasing) | ৭৫.০০% | ৯৪১ |
সুযোগ পেল যে তিন প্রতিষ্ঠান
কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিনটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে—বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে আগামী তিন মাসের জন্য পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারে এবং নতুন মূলধন সংগ্রহে সফল হয়, তবেই তারা অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। অন্যথায় তাদের ক্ষেত্রেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই তিন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান চিত্র:
বিআইএফসি: খেলাপি ঋণ ৯৭.৩০%, লোকসান ১,৪৮০ কোটি টাকা।
প্রাইম ফাইন্যান্স: খেলাপি ঋণ ৭৮%, লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা।
জিএসপি ফাইন্যান্স: খেলাপি ঋণ ৫৯%, লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা।
আর্থিক খাতের সামগ্রিক সংকট ও সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৫,৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১,৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি। এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে জামানতের পরিমাণ মাত্র ৬,৮৯৯ কোটি টাকা।
বিপরীতে, বাকি ১৫টি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭.৩১ শতাংশ এবং গত বছরে তারা সম্মিলিতভাবে ১,৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। মূলত এই বৈষম্যই আর্থিক খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে যে, যেসব প্রতিষ্ঠান অবলুপ্ত করা হবে, তাদের সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের চাকরির বিধি অনুযায়ী সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেশের আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
