আর্থিক সক্ষমতায় শীর্ষ ১৫ ব্যাংকের কাতারে যেতে চায় মেঘনা

নতুন প্রজন্মের মেঘনা ব্যাংক তাদের ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেশের শীর্ষ ১৫টি ব্যাংকের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং রিটেইল ব্যাংকিং খাতে নিজেদের পদচিহ্ন বিস্তৃত করার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করতে চান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ব্যাংকটি এখন কেবল বড় করপোরেট ঋণের ওপর নির্ভর না করে প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং ও তৃণমূল অর্থায়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

কৌশলগত রূপান্তর: করপোরেট থেকে এসএমই

বর্তমানে মেঘনা ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই করপোরেট খাতে। তবে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থিরতা ও উচ্চ খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকটি এখন তাদের পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা করছে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে ‘কনসেন্ট্রেশন রিস্ক’ বা কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি বেশি থাকে, যা অনেক সময় ব্যাংককে সংকটে ফেলে। এই ঝুঁকি এড়াতে মেঘনা ব্যাংক এখন খুচরা ঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাংকটির বিশ্বাস, ছোট ছোট ঋণের প্রবাহ গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করার পাশাপাশি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আমানতকারীদের আস্থা

দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে যখন গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, তখন মেঘনা ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণ (NPL) ৬ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থার জন্য এটি একটি বড় মাইলফলক।

মেঘনা ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক ও কৌশলগত অবস্থান:

সূচক/বিষয়বিবরণ ও পরিসংখ্যান
খেলাপি ঋণের হার৬ শতাংশের নিচে (নিয়ন্ত্রিত)
ব্যবসায়িক বয়স১৩ বছর (চতুর্থ প্রজন্ম)
বর্তমান পোর্টফোলিও৮০% করপোরেট ঋণ
ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারএসএমই, রিটেইল ও ডিজিটাল ব্যাংকিং
ডিজিটাল সেবামেঘনা পে (MFS) ও ইন্টিগ্রেটেড ব্যাংকিং
আর্থিক লক্ষ্যমাত্রাশীর্ষ ১৫ ব্যাংকের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ রূপরেখা

মেঘনা ব্যাংক মনে করে, আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি প্রযুক্তি নির্ভর। এজন্য তারা চারটি ভিন্ন প্লাটফর্মকে—ওয়েব ব্যাংকিং, করপোরেট ব্যাংকিং, রিটেইল ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (মেঘনা পে)—একটি সমন্বিত সিস্টেমে নিয়ে আসার কাজ করছে। এই সিস্টেমটি চালু হলে গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় না গিয়েই লেনদেন ও ঋণের সুবিধা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও ডিজিটাল লেন্ডিং বা দূরবর্তী ঋণ সুবিধা জনপ্রিয় করতে চায় মেঘনা।

বিনিয়োগ পরিবেশ ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বড় উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছেন, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কিছুটা কম। অনেক ব্যাংক এখন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিলে অর্থ রাখছে। তবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আবার চাঙা হবে বলে মেঘনা ব্যাংক আশাবাদী।

ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নিয়ে সৈয়দ মিজানুর রহমান স্পষ্ট জানান, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ পাচার করেছে তাদের সুযোগ দিয়ে লাভ নেই। তবে যারা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা বা মুদ্রা বিনিময় হারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের প্রকৃত সহায়তা প্রয়োজন। সঠিক সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মেঘনা ব্যাংক কেবল মুনাফা নয়, বরং ব্যালেন্স শিটের শক্তিতে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক হতে চায়।

Leave a Comment