পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা পরিবার-পরিজনের ঈদসংক্রান্ত ব্যয় নির্বাহের জন্য আগাম অর্থ পাঠানো শুরু করায় চলতি মে মাসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম ১৬ দিনে দেশে এসেছে ১৯৬ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা বিনিময় হার ধরে এ হিসাব করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি রেমিট্যান্স।
রোববার (১৭ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৬ মে পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ১২৯ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হচ্ছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন এর মধ্যে অন্যতম। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণের ফলে প্রবাসীদের জন্য দ্রুত ও সহজে অর্থ পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশা করছেন, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে মে মাসের বাকি সময়েও রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। সাধারণত বড় ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে প্রবাসীরা পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে বাড়তি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় চলতি মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও জোরালো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি বজায় রয়েছে। জুলাইয়ে দেশে আসে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়ায় ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে। জানুয়ারিতে আসে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার এবং মার্চে সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার। এপ্রিলে দেশে এসেছে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে চলতি মে মাসের ১ থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে, যার পরিমাণ ৩৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার, ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার এবং অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে মে মাস শেষে রেমিট্যান্স নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় পরিশোধ সক্ষমতা বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বৈধ চ্যানেলে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
