ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেন নির্বিঘ্ন রাখতে আন্তঃব্যাংক চেক নিষ্পত্তি এবং সীমিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার বিশেষ সময়সূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি)-২ থেকে বৃহস্পতিবার জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মূলত তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেতন, উৎসব বোনাস ও অন্যান্য আর্থিক প্রাপ্য সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঈদের সরকারি ছুটির মধ্যেও আগামী ১৮ ও ১৯ মার্চ দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে নির্বাচিত ব্যাংক শাখা সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় তৈরি পোশাক শিল্পের কার্যক্রম বেশি এবং যেখানে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস প্রদানের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি—সেসব এলাকায় এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাগুলোতে সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হবে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং কার্যক্রম মূলত ঢাকা মহানগরী এবং এর আশপাশের শিল্পঘন এলাকাগুলোতে পরিচালিত হবে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে আশুলিয়া, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের কয়েকটি শিল্পাঞ্চল। এই অঞ্চলগুলোতে দেশের বৃহৎ পোশাক কারখানাগুলোর বড় অংশ অবস্থিত এবং এখানেই বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হলো তৈরি পোশাক শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি এই খাত থেকে আসে। বর্তমানে এই শিল্পে প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন। প্রতি বছর ঈদের আগে এসব শ্রমিকের বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাস পরিশোধের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন করতে হয়। এ সময় ব্যাংকিং কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হতে পারে এবং রপ্তানি সংশ্লিষ্ট বিল নিষ্পত্তিতেও জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ সময়সূচি নির্ধারণ করেছে।
ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত দুই দিন ব্যাংকের অফিস সময় থাকবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। তবে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য লেনদেনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত যোহরের নামাজের বিরতি থাকবে।
ঈদের ছুটির মধ্যেও ব্যাংকগুলোর মধ্যে অর্থ স্থানান্তর এবং চেক নিষ্পত্তি অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউস (বিএসিএইচ), রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) এবং বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন) চালু রাখা হবে। এর ফলে আন্তঃব্যাংক লেনদেন, রপ্তানি বিল নিষ্পত্তি এবং বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
ঈদকালীন চেক নিষ্পত্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষ ক্লিয়ারিং সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে। নিচে সংশ্লিষ্ট সময়সূচি তুলে ধরা হলো—
| কার্যক্রম | চেক জমা দেওয়ার শেষ সময় | নিষ্পত্তির সময় |
|---|---|---|
| হাই ভ্যালু চেক ক্লিয়ারিং | সকাল ১১:৩০ | দুপুর ১২:৩০ |
| রেগুলার ভ্যালু চেক ক্লিয়ারিং | দুপুর ১২:০০ | দুপুর ১:০০ |
এ ছাড়া আরটিজিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ের লেনদেন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত চালু থাকবে। একই সময়ে আন্তঃব্যাংক ফান্ড ট্রান্সফার এবং রিটার্ন কার্যক্রম সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই নির্দেশনা দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রস্তুত রাখা এবং গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে সর্বাত্মক প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের আগে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে আর্থিক লেনদেনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে বেতন ও বোনাস পরিশোধ একটি বড় আর্থিক কার্যক্রম। তাই ঈদের ছুটির মধ্যেও সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং সেবা চালু রাখার এই উদ্যোগ শ্রমিকদের সময়মতো পাওনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের আর্থিক কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
