ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ সাম্প্রতিক একটি সেমিনারে সতর্ক করেছেন যে, উচ্চ সুদহার, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নীতি দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছর ধরে নিম্নতম পর্যায়ে নেমেছে, যা শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সেমিনারটির শীর্ষক ছিল “বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ”। এতে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথি হিসেবে সংযুক্ত হন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ড. মঞ্জুর হোসেন (সদস্য, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন), এ এইচ এম জাহাঙ্গীর (অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক, এসএসজিপি) এবং ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন (প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক)।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি খাতের নেতারা আলোচনায় অংশ নেন। এদের মধ্যে ছিলেন ড. জায়েদী সাত্তার (চেয়ারম্যান, পিআরআই), ড. এ কে এনামুল হক (মহাপরিচালক, বিআইডিএস), অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), অধ্যাপক এম রিয়াজ আসাদুল্লাহ (রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য) এবং ফয়সাল সামাদ (পরিচালক, বিজিএমইএ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সুরমা গার্মেন্টস)।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ সাকি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সরকার সতর্ক ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে স্থানীয় ও বৈশ্বিক ঋণের ওপর নির্ভর কমাতে করজাল সম্প্রসারণের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো জরুরি।”
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, “ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত বৈশ্বিক বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। দেশে শিল্প খাতের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। এছাড়া, মার্কিন প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি স্থানীয় ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, “বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি ৯% এ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ না করলে হঠাৎ সুদের হ্রাস বা অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।”
ফয়সাল সামাদ সতর্ক করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-তে আমাদের পণ্যের বাজার ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ওই অঞ্চলের সঙ্গে কোনও এফটিএ নেই। উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম পিছিয়ে দিচ্ছে। জিটিএফ ফান্ডের সঠিক ব্যবহার এখন সময়োপযোগী।”
প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের তুলনামূলক চিত্র
| সূচক | বর্তমান মান | মন্তব্য |
|---|---|---|
| বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৫.২% | সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে |
| মুদ্রাস্ফীতি | ৯% | সংকট পরিস্থিতিতে বৃদ্ধি সম্ভাবনা |
| ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার | ১২-১৩% | উদ্যোক্তাদের জন্য উচ্চ |
| জ্বালানি আমদানির নির্ভরশীলতা | ৭০% | শিল্প খাতের খরচে প্রভাবশালী |
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নীতি দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি সংকটাপন্ন। ঋণ সম্প্রসারণ, সুদের হ্রাস, করজাল সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। তবে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা ও নীতি বাস্তবায়নের কার্যকরতা বাড়ানো না হলে, এই অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য এখন সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে বৈশ্বিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদ এবং নীতি দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে।
