সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের জন্য উৎসাহ বোনাস প্রদানে পৃথক নীতিমালা জারির ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে বিতর্ক ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো লোকসানে থেকেও বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে ভালো পরিচালন কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে করে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রেখে এবং বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের মূল্যহ্রাস বা মূল্যবৃদ্ধির প্রভিশন সমন্বয় করে নিট মুনাফা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক সূচকের ভিত্তিতে উৎসাহ বোনাসের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো ব্যাংক লোকসানে থাকলেও মন্ত্রণালয় চাইলে বিশেষ বিবেচনায় একটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন দিতে পারবে।
অন্যদিকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা জারি করেছে, তা অনেক বেশি কড়াকড়ি ও নিয়ন্ত্রণমূলক। এই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো বেসরকারি ব্যাংক প্রকৃত নিট মুনাফা অর্জন না করলে কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। পাশাপাশি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা ও নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে সামান্য ঘাটতি থাকলেও বোনাস প্রদানের সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকার বিলম্ব সুবিধা বা ছাড় নিয়ে যে মুনাফা দেখানো হয়, সেটিকে প্রকৃত মুনাফা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতিতে সময়সীমা বাড়ানোর সুবিধা নেওয়া হলেও সেই ব্যাংক উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। ফলে বাস্তবে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের জন্য এই সুবিধা প্রায় অপ্রাপ্য হয়ে উঠছে।
উল্লেখযোগ্য যে, উৎসাহ বোনাস সাধারণত এক মাসের মূল বেতনের সমান হয়ে থাকে এবং অতীতে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ সাতটি পর্যন্ত বোনাস দিয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তাকে দুই কোটি টাকার বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব অনিয়ন্ত্রিত বোনাস বিতরণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরে ধীরে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করে।
তবে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন, যখন সরকারি ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি ও মূলধনে দীর্ঘদিন ধরে বড় ঘাটতি রয়েছে, তখন সেসব ব্যাংকে বোনাস প্রদানের সুযোগ রাখা কতটা যৌক্তিক। তাঁদের মতে, এই বৈষম্যমূলক নীতিমালা কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেবে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন করে তুলবে।
