এক বছরে রিজার্ভসম প্রবাসী আয়

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা আরও একবার শক্তভাবে প্রমাণিত হলো সদ্য বিদায়ী ডিসেম্বর মাসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই এক মাসেই দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩২২ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল গত বছরের মার্চ মাসে, ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে।

নভেম্বর মাসে যেখানে প্রবাসী আয় ছিল প্রায় ২৮৯ কোটি ডলার, সেখানে ডিসেম্বরেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২২ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩৩ কোটি ডলার বেশি এসেছে দেশে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসীদের মধ্যে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে, যা এই উল্লম্ফনের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার। এই অঙ্কটি প্রায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সমান, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ধারাবাহিক এই প্রবাহের কারণে ব্যাংক খাতে ডলারের সংকট বড় আকার ধারণ করেনি এবং বাজারে বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।

বছরজুড়েই ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কিনেছে। এর ফলেই ২০২৫ সালের শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২১ সালে দেশের রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে তা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে এসেছিল মাত্র ২৬ বিলিয়ন ডলারে। তখন ব্যাংক খাতে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ডলারের দর কমে প্রায় ১২২ টাকায় স্থিত হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা কমে যাওয়া, অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণে আসা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের স্থিতিশীল বিনিময় হার—সব মিলিয়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন প্রবাসীরা।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার দিন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ২ হাজার ৮৫১ কোটি ডলার। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে সাতটি ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার কিনেছে, প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে। ফলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১৩ কোটি ডলার, যার মধ্যে শুধু ডিসেম্বর মাসেই এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রবাসী আয় ও রিজার্ভের চিত্র

সূচকপরিমাণ
ডিসেম্বর ২০২৫ প্রবাসী আয়৩২২ কোটি ডলার
নভেম্বর ২০২৫ প্রবাসী আয়২৮৯ কোটি ডলার
২০২৫ সালের মোট প্রবাসী আয়৩,২৮২ কোটি ডলার
মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (শেষ)৩,৩১৮ কোটি ডলার
বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ২,৮৫১ কোটি ডলার
চলতি অর্থবছরে ডলার কেনা৩১৩ কোটি ডলার

সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানকে শক্তিশালী করছে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার নতুন আশার সঞ্চার করছে।

Leave a Comment