বাংলাদেশের অ-ব্যাংক আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্য এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এই খাতের খেলাপি ঋণের (NPL) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯,৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৭.১১ শতাংশ। এর অর্থ হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৭ টাকাই এখন আদায়ের অযোগ্য বা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। জুন ২০২৫ শেষে এই হার ছিল ৩৫.৭২ শতাংশ; অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১,৮৬৭ কোটি টাকা।
Table of Contents
ঋণের চেয়ে খেলাপির গতি বেশি
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এনবিএফআই খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯,২৫১ কোটি টাকা। উদ্বেগের বিষয় হলো, যেখানে ঋণের স্থিতি বেড়েছে মাত্র ২.৮ শতাংশ, সেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল পুরনো ঋণই নয়, বরং নতুন করে দেওয়া ঋণগুলোও দ্রুত খেলাপি হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অনেক বড় ঋণগ্রহীতা দেশত্যাগ করায় এবং তদারকি জোরদার হওয়ায় গোপন করা খেলাপি ঋণের আসল চিত্র এখন সামনে আসছে।
এনবিএফআই খাতের আর্থিক সূচকের সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| সূচক | জুন ২০২৫ | সেপ্টেম্বর ২০২৫ | পরিবর্তন (পরিমাণ/হার) |
| মোট বিতরণকৃত ঋণ | ৭৭,০৮৮ কোটি টাকা | ৭৯,২৫১ কোটি টাকা | + ২,১৬৩ কোটি টাকা |
| মোট খেলাপি ঋণ | ২৭,৫৪১ কোটি টাকা | ২৯,৪০৮ কোটি টাকা | + ১,৮৬৭ কোটি টাকা |
| খেলাপি ঋণের হার | ৩৫.৭২% | ৩৭.১১% | + ১.৩৯% বৃদ্ধি |
| মোট সম্পদের পরিমাণ | ১,০০,৭২২ কোটি টাকা | ৯৯,৪৯৩ কোটি টাকা | – ১.২২% হ্রাস |
অবসায়নের প্রক্রিয়া ও আস্থার সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ৯টি চরম সংকটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের (Liquidation) ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পর সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আস্থার সংকটের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান নতুন করে কোনো আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না, উল্টো পুরনো আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ায় তারল্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নজরদারিতে থাকা ৯টি দুর্বল প্রতিষ্ঠান
আমানতকারীদের সুরক্ষার কথা ভেবে এবং সরকারের আর্থিক দায়বদ্ধতার ৫,০০০ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে প্রথম ধাপে নিচের ৯টি প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ বা অবসায়নের তালিকায় রাখা হয়েছে:
ফাইন্যান্স কোম্পানি: এফএএস (FAS) ফাইন্যান্স, বিআইএফসি, আভিভা ফাইন্যান্স ও ফারইস্ট ফাইন্যান্স।
লিজিং কোম্পানি: প্রিমিয়ার লিজিং, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স।
সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, এই খাতের সম্পদ এবং মুনাফা অর্জন করার সক্ষমতা উভয়ই আশঙ্কাজনক হারে কমছে। আমানতকারীরা সময়মতো তাদের টাকা ফেরত না পাওয়ায় পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, যদি বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে টাকা আদায় করা না যায়, তবে এই খাতের সংকট কাটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
