এপস্টেইন যৌন পাচার কেলেঙ্কারিতে ব্যাংক অব আমেরিকার ৭২.৫ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল আলোচিত যৌন পাচার কেলেঙ্কারিতে দায়ের করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় অবশেষে সমঝোতায় পৌঁছেছে Bank of America। প্রতিষ্ঠানটি ৭২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধে সম্মত হয়েছে, যা একটি প্রস্তাবিত শ্রেণিভুক্ত (ক্লাস অ্যাকশন) মামলার নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী অভিযোগ ছিল—ব্যাংকটি বিতর্কিত অর্থদাতা Jeffrey Epstein-এর যৌন পাচার কার্যক্রমে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে।

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের ৩০ জুন থেকে ২০১৯ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত সময়ে এপস্টেইন বা তার সহযোগীদের দ্বারা যৌন নির্যাতন বা পাচারের শিকার হওয়া সব নারী এই সমঝোতার আওতায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। আইনজীবীদের তথ্যমতে, এই সময়সীমার মধ্যে অন্তত ৬০ জন নারী সরাসরি ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এই সমঝোতা ভুক্তভোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি আইনি স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সমঝোতাটি কার্যকর করতে হলে আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। মামলাটি তদারকি করছেন যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বিচারক Jed Rakoff। তিনি পক্ষগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমঝোতার শর্তাবলি দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ২ এপ্রিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছেন, যেখানে চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ব্যাংক অব আমেরিকা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই সমঝোতা তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার অবসান ঘটাবে এবং ভুক্তভোগীদের জন্য কিছুটা হলেও ন্যায়বিচারের অনুভূতি নিশ্চিত করবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, তারা কোনোভাবেই যৌন পাচার কার্যক্রমে সহায়তা করেনি। তাদের মতে, সমঝোতা মূলত আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত না করে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নেওয়া একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

Jeffrey Epstein ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ধনকুবের, যিনি ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন। ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট, ম্যানহাটনের কারাগারে বিচারাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক এখনও রয়েছে।

এই মামলাটি এককভাবে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একই আইনজীবী দলের পক্ষ থেকে আনা একাধিক মামলার অংশ। এর আগে JPMorgan Chase ২৯০ মিলিয়ন ডলার এবং Deutsche Bank ৭৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধে সম্মত হয়েছে, যা একই ধরনের অভিযোগে দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে একই ধারাবাহিকতায় দায়ের করা একটি পৃথক মামলা বিচারক Jed Rakoff-এর দ্বারা খারিজ করা হয়, যা BNY Mellon-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল। তবে ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে মামলার কিছু অংশ চলমান রাখার অনুমতি দেওয়া হয়, যা শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ সুগম করে।

নিচে প্রধান আর্থিক সমঝোতাগুলোর তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:

প্রতিষ্ঠানসমঝোতার অর্থ (মার্কিন ডলার)অভিযোগের ধরন
ব্যাংক অব আমেরিকা৭২.৫ মিলিয়নযৌন পাচারে সহায়তার অভিযোগ
জেপি মরগান চেজ২৯০ মিলিয়নএকই ধরনের অভিযোগ
ডয়েচে ব্যাংক৭৫ মিলিয়নএকই ধরনের অভিযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক সমঝোতাগুলো শুধু আর্থিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন নয়; বরং বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক যাচাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে ব্যাংকগুলোকে আরও কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সার্বিকভাবে, এই সমঝোতা একদিকে ভুক্তভোগীদের জন্য আংশিক ন্যায়বিচারের পথ উন্মুক্ত করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

Leave a Comment