আঞ্চলিক বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তি বাবদ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) ১.৫৩ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিল পরিশোধ করার পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ আবারও ২৮ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বড় অংকের এই কিস্তি মেটানোর পর বর্তমানে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ এর মাত্র কয়েকদিন আগেই প্রবাসী আয়ের সুবাদে রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল।
রিজার্ভের উত্থান-পতন ও আইএমএফ-এর হিসাব পদ্ধতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘BPM6’ ম্যানুয়াল অনুযায়ী গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৮.০৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে তা ২৯.১৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনে এই মজুত শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আশাব্যঞ্জক হওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে, যার সুযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে।
নিচে দেশের রিজার্ভ এবং ডলার ক্রয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি সারণি আকারে দেওয়া হলো:
রিজার্ভ পরিস্থিতি ও ডলার ক্রয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্য |
| বর্তমান গ্রস রিজার্ভ | ২৭.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (এসিইউ পেমেন্ট পরবর্তী)। |
| এসিইউ বিলের পরিমাণ | ১.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। |
| বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ | ২৮.০৪ বিলিয়ন ডলার (২২ ডিসেম্বর ২০২৫)। |
| চলতি অর্থবছরে ডলার ক্রয় | ৩.৫৪ বিলিয়ন ডলার (জুলাই থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত)। |
| জানুয়ারি ২০২৬-এ ডলার ক্রয় | ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। |
| সদর দপ্তর (ACU) | তেহরান, ইরান (প্রতিষ্ঠা: ৯ ডিসেম্বর ১৯৭৪)। |
| সদস্য দেশ (ACU) | বাংলাদেশসহ ৯টি আঞ্চলিক দেশ। |
এসিইউ ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রভাব
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) হলো একটি আন্তঃদেশীয় লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা যা মূলত জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ৯টি সদস্য দেশ (ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা) নিজেদের মধ্যে হওয়া বাণিজ্যিক লেনদেনের বিল প্রতি দুই মাস অন্তর নিষ্পত্তি করে থাকে। যেহেতু ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ বেশি, তাই প্রতিবারই কিস্তি পরিশোধের সময় রিজার্ভের ওপর একটি বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল ও বাজার পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহের ফলে বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ স্থিতিশীল রয়েছে। ডলারের আধিক্যের কারণে যেন বিনিময় হার (Exchange Rate) আকস্মিকভাবে কমে না যায়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত বাজার থেকে ডলার কিনে নিচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৩.৫৪ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করছে, অন্যদিকে মুদ্রা বাজারকেও স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকে, তবে এসিইউ বিল পরিশোধের ধাক্কা সামলে রিজার্ভ দ্রুতই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
