কৃত্রিম চাপে অস্থির বৈদেশিক মুদ্রাবাজার

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে সংকট তৈরির চেষ্টা করছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে পুঁজি করে বাজারে গুজব ছড়িয়ে কৃত্রিমভাবে ডলারের মূল্য বাড়ানোর অপচেষ্টা চলছে, যাতে কিছু গোষ্ঠী অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার তদারকি ও নজরদারি জোরদার করেছে। বিশেষ করে, ডলারের বিনিময় হার ১৩০ টাকায় পৌঁছাতে পারে—এমন গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরির বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচার ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে।

অস্বাভাবিক ওঠানামা এড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাময়িকভাবে বাজার থেকে ডলার ক্রয় কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। সাধারণত ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা অর্থপ্রবাহ মোট প্রবাসী আয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।

নিচে সাম্প্রতিক বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—

সূচকপরিমাণ
মার্চ ২০২৬-এ প্রবাসী আয়৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ব্যাংকের মজুত২.৩০ বিলিয়ন ডলার
মার্চ ২০২৬-এ ব্যাংকের মজুত৩.৯০ বিলিয়ন ডলার
আন্তঃব্যাংক ডলার দর১২২.৮৫ টাকা
প্রবাসী আয়ের ক্রয়দর১২৩.৫০ টাকা
খোলা বাজারে ডলার দর১২৫.৫০ টাকা

একাধিক ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে ডলারের প্রকৃত চাহিদা তেমন না থাকলেও বিনিময় হার বাড়ছে, যা স্বাভাবিক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি।

এছাড়া কিছু ব্যাংকে আগাম ডলার ক্রয়চুক্তির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃত্রিমভাবে দর বাড়ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে সরাসরি পরিদর্শনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, উচ্চ দর হওয়ায় তারা ডলার কিনতে আগ্রহী নন, কারণ প্রকৃত চাহিদা নেই। অপরদিকে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংক বাজারে অস্বাভাবিক দর তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনার কথাও নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা বাজারে জল্পনা-কল্পনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাজারের মৌলিক সূচক ইতিবাচক থাকা সত্ত্বেও ডলারের দর বৃদ্ধির এই প্রবণতা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Comment