দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিরল এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব ছাড়লেন গভর্নর। বুধবার দিনভর উত্তেজনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের পর তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। ঘটনাপ্রবাহে দেশের আর্থিক খাত ও নীতিনির্ধারণী মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি মাসের মাঝামাঝি। ১৬ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কল্যাণ পরিষদ এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের ডাকা একটি জরুরি পর্ষদ সভার কঠোর সমালোচনা করে। তাদের অভিযোগ, নতুন নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে এমন একটি সভা ডাকা প্রশাসনিক শালীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির পরিপন্থী। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে আলোচনা করার উদ্যোগকে তারা “হতাশাপ্রসূত ও অগণতান্ত্রিক” আখ্যা দেয়।
যদিও ওই সভা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়, তবু অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ২৩ ফেব্রুয়ারি গভর্নর সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের জন্য তিনজন পরিষদ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন এবং দশ দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেন। পরদিনই তাদের ঢাকা বাইরের বিভিন্ন দপ্তরে বদলি করা হয়। এই সিদ্ধান্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।
বুধবার সকালে মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একত্রিত হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানান। তারা গভর্নরের পদত্যাগও দাবি করেন এবং সতর্ক করেন যে দাবি না মানা হলে পরদিন থেকে কর্মবিরতি পালন করা হবে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ভবনের চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন, বিশেষত ব্যাংক একীভূতকরণ প্রসঙ্গে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সকলকে প্রাতিষ্ঠানিক সেবাবিধি মেনে চলতে হবে এবং নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই জানা যায়, তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে তিনি কার্যালয় ত্যাগ করেন। একই দিনে তাঁর এক চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টাকেও দায়িত্ব ছাড়তে হয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচজন কর্মকর্তার দপ্তর পুনর্বিন্যাসের ঘোষণা দেয়, যার মধ্যে ব্যক্তিগত সচিব ও নীতিনির্ধারণ সংশ্লিষ্ট এক পরিচালকও ছিলেন।
ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত সময়রেখা
| তারিখ | ঘটনা | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১৬ ফেব্রুয়ারি | জরুরি পর্ষদ সভা নিয়ে সমালোচনা | সভা সিদ্ধান্তহীনভাবে শেষ |
| ২৩ ফেব্রুয়ারি | তিন নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ | দশ দিনের জবাবের সময়সীমা |
| ২৪ ফেব্রুয়ারি | তিন কর্মকর্তার বদলি | অসন্তোষ বৃদ্ধি |
| বুধবার | প্রধান কার্যালয়ে বিক্ষোভ | গভর্নরের বিদায় |
| একই দিন | পাঁচ কর্মকর্তার পুনর্বিন্যাস | প্রশাসনিক পুনর্গঠন শুরু |
এই ঘটনাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম অস্থির অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সংবেদনশীল সময়ে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যের ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও নীতিনির্ধারণী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও সুসংগঠিত ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বিশেষজ্ঞ মহল তুলে ধরছেন।
