এই কেস স্টাডিতে আলোচিত হয়েছে এম/এস হিমালয়া সিমেন্ট লিমিটেড-এর উত্থান এবং পরবর্তী ব্যর্থতা। ১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে বাংলাদেশে শুরু হওয়া এই শিল্প প্রকল্পটি শুরুতে বড় প্রত্যাশা ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে শুরু হলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং দুর্বল তদারকি একে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়। এখানে উপস্থাপিত বিশ্লেষণ মূলত ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের (MBA/M.Com) সিনিয়র শিক্ষার্থী এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য, যাতে ব্যর্থতার কারণগুলো চিহ্নিত করা যায়।
Table of Contents
উদ্যোক্তার পটভূমি
মি. করিম, একজন বাংলাদেশি নাগরিক, লন্ডনে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে পারিবারিক হোটেল ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশে ফেরার সময় একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন নিয়ে আসেন, যার মাধ্যমে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করেন।
১৯৮৮ সালে তিনি একটি সিমেন্ট উৎপাদন প্রকল্পের প্রস্তাব ব্যাংকে জমা দেন এবং ২৫ কোটি টাকা ঋণ চান। রাজনৈতিক প্রভাব ও কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার সহায়তায় ঋণটি অনুমোদিত হয়।
কোম্পানি গঠন
মি. করিম তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি গঠন করেন। কিন্তু কোম্পানির পরিচালকরা কারও শিল্প খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা সম্পূর্ণভাবে ভাড়াটে টেকনিক্যাল ও ব্যবস্থাপনা কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এটাই দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটির ব্যর্থতার অন্যতম মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন
কোম্পানি চীন ও ভারত থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এল/সি (Letter of Credit) খোলে। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে—
নির্বাচিত যন্ত্রপাতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ ও অনুপযুক্ত।
সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতি প্রকল্প স্থানে ভারসাম্যহীন ও অপ্রতুল প্রমাণিত হয়।
কারখানার ভবন নির্মাণও বিলম্বিত হয় অপর্যাপ্ত নকশার কারণে।
এসব সমস্যার কারণে প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় নির্ধারিত সময়ের দুই বছর পর।
আর্থিক ও কার্যকরী সমস্যা
প্রকল্প বিলম্বের কারণে দায়বদ্ধতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। যদিও ঋণের মেয়াদ ছিল ১২ বছর, যার মধ্যে ৩ বছর ছিল গ্রেস পিরিয়ড, তবে বিলম্ব ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
প্রকল্প চালু হওয়ার পর কোম্পানি মুনাফা অর্জন করতে শুরু করে। কিন্তু উদ্যোক্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করেননি। ফলে কোম্পানিকে ঋণখেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ব্যাংক উদ্যোক্তাদের অনুরোধে ঋণ পুনঃতফসিল করে দিলেও কোম্পানি আবারও ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ইনসলভেন্সি আইন ১৯৯৯ এর অধীনে মামলা দায়ের করে। পরে কোম্পানি শেয়ার বাজারে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, তবে তখন তাদের সুনাম ও আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্যর্থতার বিশ্লেষণ
১. ঋণগ্রহীতার দিক থেকে
শিল্প জ্ঞানের অভাব: উদ্যোক্তারা সিমেন্ট শিল্প সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা রাখতেন না। যন্ত্রপাতি ক্রয় ও প্রকল্প নকশায় ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দুর্বল ব্যবস্থাপনা: পরিচালকরা ব্যবস্থাপনা দক্ষতায় অযোগ্য ছিলেন। সম্পূর্ণভাবে ভাড়াটে কর্মীদের ওপর নির্ভর করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতা দেখা দেয়।
তহবিল অপচয়: তহবিল অন্য ব্যবসায় সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা সিমেন্ট প্রকল্পের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করে।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি: পরবর্তী সময়ে মুনাফা অর্জন সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা ঋণ শোধ করেননি।
২. ব্যাংকের দিক থেকে
ভুল মূল্যায়ন: ব্যাংক উদ্যোক্তাদের শিল্প জ্ঞান, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ও প্রকল্পের কারিগরি সম্ভাবনা যথাযথভাবে যাচাই করেনি।
ঋণ বিতরণে বিলম্ব: ঋণ বিতরণে প্রশাসনিক বিলম্ব প্রকল্পের সময়সীমা ও খরচ বাড়িয়ে দেয়।
দুর্বল তদারকি: প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ব্যাংক কর্মকর্তারা যথাযথ নজরদারি করেননি। ফলে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি আমদানি ও দুর্বল ভবন নির্মাণ নজরে আসেনি।
রাজনৈতিক প্রভাব: ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ প্রভাব ফেলেছিল, যা ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নকে দুর্বল করে।
৩. বহিরাগত কারণ
সরকারি নীতির অনিশ্চয়তা: ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে শিল্প খাতে অস্থির নীতি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা নতুন প্রকল্পগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা: চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীলতা সঠিক প্রযুক্তিগত যাচাই ছাড়া ঝুঁকি তৈরি করে।
শিক্ষণীয় দিক
উদ্যোক্তাদের জন্য:
শিল্প জ্ঞান অপরিহার্য: শিল্প প্রকল্পে নামতে হলে খাত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
পেশাদার ব্যবস্থাপনা: রাজনৈতিক প্রভাব নয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন ব্যবসার সফলতার চাবিকাঠি।
আর্থিক শৃঙ্খলা: ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ভবিষ্যৎ তহবিল সংগ্রহের সুযোগ ধ্বংস করে।
ব্যাংকের জন্য:
কঠোর প্রকল্প মূল্যায়ন: ঋণ অনুমোদনের আগে কারিগরি, আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা দিক যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে।
নিয়মিত তদারকি: বড় শিল্প ঋণের বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিবিড় নজরদারি অপরিহার্য।
রাজনৈতিক প্রভাব এড়ানো: ঋণ অনুমোদন অবশ্যই যোগ্যতা ও প্রকল্পের ভিত্তিতে হতে হবে, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবে নয়।
নীতিনির্ধারকদের জন্য:
স্থিতিশীল শিল্প নীতি: ধারাবাহিক ও সহায়ক নীতি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে এবং জবাবদিহিতা বাড়ায়।
দৃঢ় ইনসলভেন্সি কাঠামো: ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দায়বদ্ধ রাখতে এবং ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন।
এম/এস হিমালয়া সিমেন্ট লিমিটেড-এর ব্যর্থতা প্রমাণ করে কিভাবে দুর্বল উদ্যোক্তা দৃষ্টি, শাসন ব্যবস্থার অভাব, ব্যাংকের ভুল চর্চা এবং নীতি পর্যায়ের অদক্ষতা মিলিতভাবে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প প্রকল্পকে ব্যর্থ করতে পারে। প্রকল্পটি কিছু সময়ের জন্য লাভজনক হলেও সিস্টেমিক দুর্বলতা একে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে।
ব্যবসায় শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—কৌশলগত পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত যাচাই-বাছাই ও নৈতিক দায়িত্ব অপরিহার্য। ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্যও এটি একটি শিক্ষা—ঋণ অনুমোদন, তদারকি ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা জরুরি। এসব শিক্ষা ভবিষ্যতে অনুরূপ শিল্প প্রকল্পের ব্যর্থতা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।