বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রচলিত কাঠামোতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি জারি করা ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬’ এর মাধ্যমে দেশে একটি নতুন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান—‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে। মূলত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করা ‘সোশ্যাল বিজনেস’ বা সামাজিক ব্যবসা মডেলের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রান্তিক মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
Table of Contents
অর্ডিন্যান্সের মূল লক্ষ্য ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো
এতদিন দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) মূলত দাতা সংস্থা, পাইকারি ঋণ এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সীমিত নজরদারিতে পরিচালিত হতো। নতুন এই অধ্যাদেশ অনুসারে, এই ব্যাংকগুলো এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসবে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতোই নিম্ন-আয়ের গ্রাহক এবং বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে, যা আগে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সদস্য বা ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
নতুন এই ব্যাংকগুলোর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
সারণি: মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত বিবরণ |
| ব্যবসায়িক মডেল | সামাজিক ব্যবসা (সোশ্যাল বিজনেস) |
| অনুমোদিত মূলধন | ৫০০ কোটি টাকা (প্রতি শেয়ার ১০০ টাকা মূল্যের ৫ কোটি শেয়ার) |
| পরিশোধিত মূলধন | সর্বনিম্ন ২০০ কোটি টাকা |
| শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো | ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডাররা অন্তত ৬০% মালিকানার অংশীদার হবেন |
| বোর্ড গঠন | ১০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ (৪ জন ঋণগ্রহীতা প্রতিনিধি, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক) |
| পরিচালনা কর্তৃপক্ষ | বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশন বা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ |
সামাজিক ব্যবসা ও মুনাফা বণ্টন নীতি
এই ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এদের লভ্যাংশ নীতি। সামাজিক ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের মূল বিনিয়োগকৃত অর্থই লভ্যাংশ হিসেবে ফেরত পাবেন। এর অতিরিক্ত কোনো মুনাফা বিনিয়োগকারীরা নিতে পারবেন না; বরং সেই বাড়তি মুনাফা একটি বিশেষ রিজার্ভ ফান্ডে জমা হবে যা সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। এটি মূলধনী সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে একটি জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলবে।
ঋণ পুনরুদ্ধার ও গ্রাহক সুরক্ষা
ক্ষুদ্রঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে অতীতে বিভিন্ন সময়ে হয়রানির অভিযোগ থাকলেও নতুন অধ্যাদেশে গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ঋণ খেলাপি হলে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ বা মানহানি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নোটিশ প্রদান: ঋণ আদায় কার্যক্রম শুরুর আগে গ্রাহককে অবশ্যই ১৫ দিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে।
পুনঃতফসিলকরণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিল বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) পদ্ধতিতে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
মানবিক মর্যাদা: কোনোভাবেই গ্রাহককে হয়রানি বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা যাবে না। যদি এসব প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, তবেই কেবল অর্থঋণ আদালত আইনের আওতায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনা
এই অধ্যাদেশে ‘ক্ষুদ্র উদ্যোগ’ (Micro Enterprise) এর স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ২৫ জন কর্মী এবং ১.৫ কোটি টাকার কম সম্পদসম্পন্ন ব্যবসাগুলো এই ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা পাবে। এর ফলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং নতুন কর্মসংস্থানের জোয়ার আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বড় পুঁজির বাধ্যবাধকতা থাকায় ছোট ছোট এনজিও-ভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত হওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।
সামগ্রিকভাবে, এই অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মূল ধারার বাইরে থাকা কোটি কোটি মানুষকে একটি সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
