ক্ষুদ্র আমানতই ব্যাংকের প্রধান চালিকা শক্তি

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের আমানতকারীরাই এখনো প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দেশের মোট আমানতের ৯২ শতাংশই এক কোটি টাকার কম আমানতধারীদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। ব্যাংকগুলো ছোট ছোট আমানত আকৃষ্ট করতে ডিজিটাল সুবিধা, খুচরা সেবা এবং প্রণোদনার মতো নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের পাঠানো প্রবাসী আয়ও ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

ব্যাংকে আমানতের আকারভিত্তিক হিসাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের বণ্টন নিম্নরূপ:

আমানতের পরিমাণমোট আমানতের অংশ (%)২০২৪ সালের শেষে (কোটি টাকা)২০২৫ সালের শেষে (কোটি টাকা)হিসাবধারীর সংখ্যা (লাখ)
২ লাখ পর্যন্ত১৩১,৩৮,১০০১,৫৬,৭০০১৩৫৯ → ১৫৪৮
২ লাখ ১ → ২৫ লাখ৫৫৫,৫২,২০০৬,৫২,২০০৯৩ → ১১১
২৫ লাখ ১ → ৫০ লাখ১৩১,৩৭,৬০০১,৫৭,৩০০৩.৮১ → ৪.৩৪
৫০ লাখ ১ → ১ কোটি১১১,১২,০০০১,২৬,০০০১.৬২ → ১.৮১
১ কোটি টাকার বেশি৮৩,৫০০৮৩,১০০৩৫,৩৯৪ → ৩৮,৩১৬

এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, ব্যাংক খাতের আমানত কাঠামো মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের আমানতের ওপর নির্ভরশীল। এক কোটি টাকার বেশি আমানতধারীর সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও, এ ধরনের উচ্চমূল্যের আমানতের মোট অংশ কমেছে।

সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি

২০২৫ সালে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্যাংক খাতে মোট আমানতের বৃদ্ধির হার ছিল ১১.৫ শতাংশ, আর ঋণের বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৮,৮৩,৭০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের শেষে বেড়ে হয়েছে ২১,৫০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত মোট ঋণ ১৬,৮২,৯০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭,৭৭,৩০০ কোটি টাকায়।

প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানত বৃদ্ধিতে শীর্ষে ছিল। প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর আমানতে বৃদ্ধি ১৫.৩ শতাংশ, আর রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর বৃদ্ধি ছিল ১১.৬ শতাংশ। ছোট খুচরা আমানতের প্রবৃদ্ধি বড় আমানতের তুলনায় বেশি। ব্যক্তিগত বা গৃহস্থালি আমানত ২০২৪ সালের শেষে ছিল ১০,৩৪,১০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১১,৮০,৬০০ কোটি টাকায়, অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে ১৪.২ শতাংশ বৃদ্ধি।

বিশেষ মন্তব্য

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, “সব ব্যাংকের লক্ষ্যই ক্ষুদ্র ও খুচরা আমানত বাড়ানো। এসব আমানত স্থিতিশীল, সহজে উত্তোলন হয় না এবং সুদের হারও তুলনামূলক কম থাকে। ব্যাংকের ভিত্তি যত বেশি খুচরা আমানতের ওপর দাঁড়ায়, ততই ব্যাংক মজবুত থাকে।”

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের এই তথ্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমানতই দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার মূল স্তম্ভ।

Leave a Comment