২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি ছিল সংকটমুখী—সুদের হার বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাহিদার অভাব, মার্জিন সংকুচিত হওয়া এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মুনাফা সংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল উল্টো। ব্যাংকগুলোর মুনাফা কেবল টিকে থাকেনি, বরং বিশেষত “ভালো ব্যাংকগুলোর” মুনাফা বেড়েছে। তবে এই মুনাফার বড় উৎস ছিল সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল থেকে পাওয়া আয়। সরকারের সিকিউরিটিজ এখন ব্যাংকগুলোর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থা বদলে দিয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংক: ট্রেজারি এখন জীবনদায়ী
ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় ছিল ৭০০-৮০০ কোটি টাকা, কিন্তু ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৮৮০ কোটি টাকায়—অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি। ২০২৩ সালে এই আয় বেড়েছিল ৬৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে আরও ১২৭ শতাংশ। এর ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১,৫৫৩ কোটি টাকায়। তবে, নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম (ঋণ ও আমানতের সুদের পার্থক্য) ৭ শতাংশ বা ১০০ কোটি টাকা কমে গেছে। অর্থাৎ ব্যাংকটির আয় মূলত ট্রেজারি বন্ড থেকে এসেছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, “ঋণ দেওয়ার সুযোগ কমে গেছে, তাই অতিরিক্ত তারল্য সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ না রাখলে আমানতের সুদের হার কমাতে হতো।” তবে তিনি এই আয়কে “অস্থায়ী ও অটেকসই” বলে উল্লেখ করেছেন।
সিটি ব্যাংক: ঋণ নয়, বন্ডে আয়
সিটি ব্যাংকও একই পথে চলেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির কর পরবর্তী মুনাফা ৬০ শতাংশ বেড়ে ৭২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যার প্রায় পুরোটা এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজ বা বন্ড থেকে। সিটি ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় এক বছরে দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২,৭৭৫ কোটি টাকা। ব্যাংকের মূল ঋণ ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রমাণ, নেট সুদ আয় প্রায় ৮৭ শতাংশ কমে ১৫০ কোটি টাকায় নেমে গেছে।
একজন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “এই মুনাফা ঋণ থেকে আসেনি, বরং বন্ড বাজারের ওপর ভর করে ব্যাংকটি টিকে থাকার কৌশল নিয়েছে।”
ইস্টার্ন ব্যাংক: স্থিতিশীলতার ভরসা ট্রেজারিতেই
ইস্টার্ন ব্যাংকও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে সফল। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় দ্বিগুণ হয়ে ৫০৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১,০১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে এই আয় আরও ৩৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৯৫ কোটি টাকায়। ব্যাংকের মোট পরিচালন আয়ের ৪৮ শতাংশ এখন ট্রেজারি আয় থেকে আসছে, যেখানে আগের বছর এটি ছিল ৩৯ শতাংশ।
এমটিবি: মুনাফার মার্জিন সংকুচিত
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) গত বছর বিপরীত পরিস্থিতিতে পড়েছিল। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির নেট সুদ আয় ৫৮ শতাংশ কমে ২৬৩ কোটি টাকায় নেমে গেছে, কিন্তু বিনিয়োগ আয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৯৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এমটিবির মোট পরিচালন আয়ের ৬০ শতাংশ এখন সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আসছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাজারে ঋণ চাহিদা কমে গেছে, আর তাই মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে আয় কমে গেছে।”
প্রাইম ব্যাংক: সিকিউরিটিজে আয় বৃদ্ধি
প্রাইম ব্যাংকেও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় দ্বিগুণ বেড়ে ১,০২৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর ফলে ব্যাংকের মোট পরিচালন আয়ের ২২.৫ শতাংশ এখন এই খাত থেকে এসেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়ে সিকিউরিটিজ থেকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আয় হয়েছে।
ব্যাংক এশিয়া: মুনাফার ভরসা এখন ট্রেজারি
ব্যাংক এশিয়া ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে, কিন্তু সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল থেকে আয় বেড়ে ১,২৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এখন ব্যাংকটির প্রতি ১০ টাকার মধ্যে ৯ টাকাই আসছে এই খাত থেকে।
ডাচ-বাংলা ব্যাংক: বন্ডের ওপর নির্ভরতা
ডাচ-বাংলা ব্যাংকও বন্ডে বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৪৭ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এই আয় ১২৭ শতাংশ বেড়ে ৯৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর ফলে ব্যাংকের মোট পরিচালন আয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন ট্রেজারি থেকে আসছে।
সরকারের ঋণ বাড়ছে, সুদের হারও বেড়েছে
গত পাঁচ বছরে সরকারের দেশীয় ঋণ দ্বিগুণ হয়ে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সরকারি সিকিউরিটিজের জিডিপিতে অনুপাত বেড়ে ১১.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে গত কয়েক মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কিছুটা কমে গেছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং ঋণের খরচ কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঋণ চাহিদা বাড়বে কি?
বিভিন্ন ব্যাংকের এমডি এবং ট্রেজারি প্রধানদের মতে, নির্বাচনের পরেই ঋণ চাহিদা বাড়বে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক হয়ে বলেছেন, সরকার যদি যথেষ্ট রাজস্ব সংগ্রহ না করতে পারে, তাহলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
