ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকার ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির পর কিছু ব্যাংক পুনরায় কার্যক্রম শুরু করলেও, নগদ অর্থের ভয়াবহ ঘাটতি গাজাবাসীর জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নগদ অর্থের সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে, আর ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন।
Table of Contents
ব্যাংক খোলার পরও হতাশ গাজাবাসী
গত দুই বছরে ধারাবাহিক ইসরায়েলি হামলায় ঘরবাড়ি, স্কুল, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকসহ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ছয় দিন পর, ১৬ অক্টোবর থেকে কিছু ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে।
তবে ব্যাংক খোলার পর দেখা যায়—
অর্থ তোলার আশায় হাজার হাজার মানুষ ব্যাংকের বাইরে সারিতে দাঁড়ালেও অধিকাংশই দীর্ঘ অপেক্ষার পর হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, কারণ ব্যাংকে নগদ অর্থ নেই।
এদিকে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় আরও দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮,৫২৭ জনে।
এ সময় গাজায় ত্রাণ ও অন্যান্য পণ্যও ইসরায়েলের কড়া নজরদারিতে প্রবেশ করছে।
নগদ অর্থের সংকট ও দৈনন্দিন দুর্ভোগ
গাজার মধ্যাঞ্চলের নুসেইরাতে ব্যাংক অব প্যালেস্টাইনের বাইরে নগদ অর্থের আশায় সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন ওয়ায়েল আবু ফারেস (৬১)। তিনি বলেন—
“ব্যাংকে কোনো অর্থ নেই। নগদ অর্থের প্রবাহ নেই। ছয় সন্তানের বাবা হিসেবে কেবল কাগজপত্রের লেনদেন করেই ফিরে যেতে হচ্ছে।”
গাজায় প্রায় সব লেনদেন নগদ অর্থে সম্পন্ন হয়—খাবার কেনা, বিল পরিশোধ বা সাধারণ সেবাদান পর্যন্ত।
কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি অবরোধে গাজায় নগদ অর্থ, পণ্য ও সরঞ্জাম প্রবেশ প্রায় বন্ধ।
যদিও এখন কিছু ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করছে, তা নগদ অর্থের ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয়।
ব্যাংকে অর্থ না থাকায় নতুন বাণিজ্য
গাজার অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আবু জাইয়্যাব বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান—
“ব্যাংক খোলা আছে, এসি চলছে, কিন্তু মূলত কিছুই হচ্ছে না। ইলেকট্রনিক লেনদেন ছাড়া অন্য কোনো কাজ চলছে না, কারণ কোনো আমানত নেই।”
তিনি আরও জানান—
“মানুষ বেতন ক্যাশ করার জন্য কিছু লোভী ব্যবসায়ীর কাছে যাচ্ছেন, যারা ২০% থেকে ৪০% পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বেতন ক্যাশ করে দিচ্ছেন।”
সাধারণ মানুষের হাহাকার
সাত সন্তানের মা ইমান আল–জাবারি বলেন—
“আগে ব্যাংক লেনদেন শেষ করতে এক ঘণ্টাও লাগত না। এখন দুই-তিন দিন ধরে আসতে হয়, দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এত কষ্ট করে আপনি হয়তো ৪০০–৫০০ শেকেল (১২৩–১৫৩ ডলার) তুলতে পারবেন। এই উচ্চমূল্যের বাজারে এ টাকায় কী কেনা সম্ভব? আমরা আর পারছি না।”
অন্যদিকে, নগদ অর্থের ঘাটতি থেকে নতুন পেশারও উদ্ভব হয়েছে।
যেমন, মানাল আল–সাইদি (৪০) নামের এক নারী ছেঁড়া ব্যাংক নোট জোড়াতালি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
| ব্যক্তির নাম | পেশা | দৈনিক আয় | আয় দিয়ে কী কেনেন |
| মানাল আল–সাইদি (৪০) | ছেঁড়া টাকা জোড়া দেওয়া | ২০–৩০ শেকেল (৬–৯ ডলার) | রুটি, অল্প শিম ও সামান্য ভাজা খাবার |
তিনি বলেন—
“সবজির দাম এত বেড়েছে যে কেনার মতো আয়ই নেই। যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে দিন চলে।”
ইলেকট্রনিক লেনদেন ও কালোবাজার
নগদ সংকটে অনেকেই এখন ব্যাংক অ্যাপের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক লেনদেন করে ডিম, চিনি বা অন্যান্য পণ্য কিনছেন। তবে বিক্রেতারা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মূল্য নিচ্ছেন।
নগদ অর্থ কবে আসবে—অজানা অনিশ্চয়তা
বর্তমানে গাজায় ত্রাণ প্রবেশের পুরো বিষয়টি ইসরায়েলি সেনাদের “কো–অর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাকটিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ (COGAT)” শাখার নজরদারিতে।
কবে বা কীভাবে নগদ অর্থ প্রবেশের অনুমোদন দেওয়া হবে—তা জানতে চাইলে সংস্থাটি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
গাজাবাসীর শেষ সম্বলও শেষ
নগদ অর্থের সংকট গাজার মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
অনেকে তাঁবু, খাদ্য ও ওষুধ কেনার জন্য সব সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছেন, এমনকি অল্প যা সম্পদ ছিল, তাও বিক্রি করে দিয়েছেন।
কিছু মানুষ এখন বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।
গাজার ব্যবসায়ী সামির নামরাউতি (৫৩) বলেন—
“এমন কিছু নোট হাতে আসছে, যা অতিব্যবহারের ফলে চিনতেই কষ্ট হয়। তবুও আমি নিচ্ছি। আমার কাছে নোটের সিরিয়াল নম্বর থাকলেই সেটা টাকাই।”
| সংকটের ধরন | প্রভাব |
| নগদ অর্থের অভাব | খাদ্য ও নিত্যপণ্য ক্রয়ে অক্ষমতা |
| ব্যাংকের অচলাবস্থা | বেতন তোলা ও সঞ্চয় ব্যবহারে বাধা |
| বাজারে মূল্যবৃদ্ধি | খাদ্যপণ্যের অপ্রাপ্যতা ও বৈষম্য বৃদ্ধি |
| ত্রাণে নজরদারি | মানবিক সহায়তার ধীর প্রবাহ |
গাজা এখন এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ব্যাংক খোলা থাকলেও অর্থ নেই,
মানুষ জীবিত থাকলেও বেঁচে থাকার উপায় নেই।
