গোপন ঋণঝুঁকিতে ব্যাংক খাত

Bangladesh Institute of Bank Management আয়োজিত “মুদ্রানীতি বিবৃতি: ব্যাংকের জন্য প্রাসঙ্গিকতা” শীর্ষক এক কর্মশালায় দেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর ঢাকায় আয়োজিত এই আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখা খেলাপি ঋণ, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়হীনতা আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

সাবেক গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ জানান, প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ—যা পূর্বে প্রকাশিত তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর ভাষায়, বছরের পর বছর সমস্যাগুলো চাপা পড়ে থাকায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বিলম্বিত হয়েছে। এতে সম্পদের গুণগত মান অবনতি ঘটেছে এবং ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা চাপে পড়েছে।

ব্যাংক খাতের চাপের সূচক

সূচকবর্তমান হিসাবসম্ভাব্য প্রভাব
প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত৩৫.৭ শতাংশসম্পদের গুণগত মানের মারাত্মক অবনতি
সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ১.৩ লক্ষ কোটি টাকার বেশিবেসরকারি ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা
মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা৪–৫ শতাংশঅর্জন ক্রমশ কঠিন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বর্তমান মুদ্রা পরিস্থিতিকে “খাপছাড়া” বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত ঋণবাজারে সম্পদের সঠিক বণ্টন ব্যাহত হচ্ছে, যা নৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সময়ে উচ্চ সুদের হার ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতাদের আকর্ষণ করতে পারে, ফলে ভবিষ্যতে খেলাপির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আলোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয় ঘাটতির কথাও উঠে আসে। নীতিগত বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট মূল্যস্থিতি অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী সতর্ক করে বলেন, সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণসংস্থান সীমিত করতে পারে। একই সঙ্গে শক্তিশালী গ্রাহকেরা তুলনামূলকভাবে সুশাসিত ব্যাংকে স্থানান্তরিত হচ্ছেন—ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন পরিকল্পনা, সুশাসন জোরদার, সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণ এবং দেশীয় বন্ডবাজার উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ ও নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থার প্রসারেও জোর দেওয়া হয়েছে।

উপগভর্নর নূরুন নাহার মুদ্রানীতি বিবৃতিকে ব্যাংকগুলোর জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা হিসেবে বর্ণনা করেন। কর্মশালার সভাপতি মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম গবেষণানির্ভর সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, টেকসই সংস্কার ও জবাবদিহিতা ছাড়া ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।

Leave a Comment