গ্রামীণ ব্যাংক

গ্রামীণ ব্যাংক দেশের পল্লী অঞ্চলের ভূমিহীন দরিদ্র নারী-পুরুষদের জন্য ঋণ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর অধীনে একটি কর্পোরেট সংস্থা হিসেবে ঐ বছরের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ ধরনের ব্যাংক। ব্যাংকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতোমধ্যে বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি লাভ করেছে।

গ্রামীণ ব্যাংক লোগো, Grameen Bank Logo

চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলাধীন জোবরা গ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক ১৯৭৬ সালে চালু করা পল্লী ব্যাংকিং-এর একটি পাইলট প্রকল্প থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের উৎপত্তি। গ্রামের ভূমিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্ভরযোগ্য উপায়ে জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের উপযোগিতা ও সাংগঠনিক কাঠামোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে জোবরা গ্রামে গ্রামীণ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। দরিদ্রদের, বিশেষত মহিলাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করলে তারা উৎপাদনমুখী আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম কি-না এ সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করাও গ্রামীণ প্রকল্পের অপর একটি উদ্দেশ্য ছিল।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ড. মুহাম্মদ ইউনূস

প্রকল্পটির আশাব্যঞ্জক ফলাফলের ভিত্তিতে মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইল জেলার আরও কয়েকটি গ্রামে এর সম্প্রসারণ ঘটান। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সম্প্রসারিত প্রকল্পের জন্য তহবিলের যোগান দেয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)-এর আর্থিক সহায়তায় ১৯৮২ সালে প্রকল্পটি ঢাকা, রংপুর এবং পটুয়াখালী জেলায় সম্প্রসারণ করা হয়। এতদিনে প্রকল্পটি দরিদ্রদের জন্য একটি ব্যাংকিং কাঠামোতে উন্নীত হয়। ফলে গ্রামীণ প্রকল্পের ব্যাংকিং ইউনিট সৃষ্টিপূর্বক সেগুলিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির স্থানীয় শাখার সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ঋণদান ও আদায় কার্যক্রম চালানো হয়।

গ্রামীণ প্রকল্পটিকে গ্রামীণ ব্যাংক নামকরণ করে একটি বিশেষায়িত ঋণদান প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শুরুতে গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ও পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১০০ মিলিয়ন ও ৩০ মিলিয়ন টাকা। ব্যাংকের মূলধন প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের সাধারণ শেয়ারে বিভক্ত। এর মোট পরিশোধিত মূলধনের ৪০% ব্যাংকটির ঋণগ্রহীতাগণ এবং অবশিষ্ট ৬০% বাংলাদেশ সরকার ও সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিশোধ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে এর কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকটির অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক মূলত ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা এবং যাদের অধিকাংশই দরিদ্র নারী। ব্যাংকের মোট ইক্যুইটির মধ্যে ৯৪% ঋণগ্রহীতাদের মালিকানায় এবং বাকি ৬% এর মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের।

গ্রামীণ ব্যাংক ভবন

ব্যাংকটির হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী-২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটি ২.৩৩ ট্রিলিয়ন টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা দেশের অন্য সব ব্যাংকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ব্যাংকটির ঋণ আদায়ের হার শতকরা ৯৪.৭ ভাগ।

২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯.২ মিলিয়ন এবং এসব সদস্যের মধ্যে ১২.২ বিলিয়ন টাকা গৃহঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটি ব্যতিক্রমধর্মী এক ধরনের ঋণ দিয়ে থাকে: বিনা সুদে জীবন-সংগ্রামী সদস্যদের (ভিক্ষুক) মধ্যে ০.১৮ বিলিয়ন টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এ টাকার মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত সদস্যের সংখ্যা ৮৩ হাজার ২১৩ জন। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৩৪টি গৃহনির্মাণে ঋণ বিতরণ করেছে ১২.২ বিলিয়ন টাকা। আর ৫৪ হাজার ৪৬৫ জন শিক্ষার্থীকে বিনা সুদে দেওয়া হয়েছে ৩.৯ বিলিয়ন টাকা। একই সঙ্গে নবীন উদ্যোক্তা তৈরিতে ২ হাজার ৪৬২ জন গ্রাহকের মাঝে ৫০০ মিলিয়ন টাকা বিতরণ করা হয়।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভূমিহীন দরিদ্র জনগণকে আয় সৃষ্টিকারী ও জীবিকানির্ভর নানাবিধ কাজের জন্য নগদ অর্থ অথবা উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে জামানতবিহীন ঋণদান করাই গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কাজ। এ ছাড়া, ব্যাংকটি আমানত গ্রহণ করে এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিজস্ব সম্পদ জামানত রেখে বা অন্যান্য উপায়ে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে। তবে এটি বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে না। ব্যাংকটি সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয়সহ ক্ষুদ্র ব্যবসায় ও শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য এর গ্রাহকদেরকে পেশাগত ও কারিগরি পরামর্শসেবা প্রদান করে। এতদ্ব্যতীত গ্রামীণ ব্যাংক আয়সৃষ্টিকারী কাজ ও ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলির স্থায়িত্ব ও সম্ভাব্যতা নিয়ে গবেষণা করে।

গ্রামীণ ব্যাংক এর অধীনে গ্রামীণ ফ্যামিলি অফ এন্টারপ্রাইজের দুই ডজনেরও বেশি উদ্যোগ/প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ ট্রাস্ট, গ্রামীণ তহবিল, গ্রামীণ কমিউনিকেশনস, গ্রামীণ শক্তি, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ শিক্ষা, গ্রামীণ মৎস্য চাষ (গ্রামীণ ফিশারিজ), গ্রামীণ ব্যবসা বিকাশ (গ্রামীণ ব্যবসায়িক উন্নয়ন), গ্রামীণ ফোন, গ্রামীণ সফটওয়্যার লিমিটেড, গ্রামীণ সাইবারনেট লিমিটেড, গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেড, এবং গ্রামীণ উদ্যোগ (গ্রামীণ চেক)।

১১ জুলাই ২০০৫-এ গ্রামীণ মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান (GMFO), সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অফ বাংলাদেশ কর্তৃক অনুমোদিত, একটি প্রাথমিক পাবলিক অফার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। এই ধরনের প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডগুলির মধ্যে একটি, জিএমএফও গ্রামীণ ব্যাংকের ৪০ মিলিয়নেরও বেশি সদস্য এবং সেইসাথে অসদস্যদের বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কেনার অনুমতি দেবে। ব্যাংক এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের আনুমানিক সমন্বিত মূল্য মার্কিন ডলার ৭.৪ বিলিয়নের বেশি।

 

গ্রামীণ ব্যাংক

 

আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য ঋণ সুবিধা পাওয়া একটি মানবিক অধিকার- এ নীতির ভিত্তিতে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রচলিত ব্যাংকিং-এ জনগণকে ঋণ গ্রহণের জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়, অর্থাৎ ঋণ গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তিকে সশরীরে ব্যাংকে হাজির হতে হয়। কিন্তু গ্রাহকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ তহবিল নিয়ে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর নীতির ভিত্তিতে তার ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক পল্লী অঞ্চলের ভূমিহীন ও অশিক্ষিত নারীদেরকে নিজস্ব ব্যবসায়, অন্যান্য আয়সৃষ্টি ও আয়বর্ধক কার্যাবলি হাতে নেওয়া ও চালানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এতে দরিদ্র মহিলারা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে কিছুটা স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষমতা লাভ করে। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের গ্রামীণ মডেল বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশসহ আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ/হ্রাসে ব্যবহূত হচ্ছে। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ও আদায়ের পদ্ধতি দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য একটি কার্যকর ও ফলপ্রসু মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি স্বরূপ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেছে।

গ্রামীণ ব্যাংক দলভিত্তিকভাবে গ্রাহকদের ঋণ প্রদান করে। ঋণ পরিশোধের জন্য একটি দলের সদস্যগণের যৌথ দায়িত্ব থাকলেও ঐ দলের প্রত্যেক ঋণগ্রহীতা তার গৃহীত ঋণ ও অগ্রিমের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকে। তবে দলের কোনো একজন সদস্যের গৃহীত ঋণ পরিশোধের জন্য অন্যান্য সদস্যগণের অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ব রয়েছে। ষোলটি মূলনীতির ভিত্তিতে ব্যাংকটি এর সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ঋণ প্রদান কার্যক্রম চালায়।

একটি ঋণগ্রহীতা দলের সকল সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে ঐ ষোলনীতি নিরিখ মুখস্ত, হৃদয়ঙ্গম এবং অনুসরণ করতে হয়। কেননা এ নিরিখগুলি তাদেরকে শৃঙ্খলা ও একতা শিক্ষা দেয় এবং উদ্দীপনা, উন্নয়ন ভাবনা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

এ সকল নিরিখ গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যগণকে নিজ নিজ পরিবারে স্বাচ্ছন্দ্য, জীর্ণশীর্ণ বাড়িতে বসবাস না-করে নিজস্ব বাড়ি তৈরি ও মেরামত করা, বছরব্যাপী শাকসব্জি উৎপাদন, খাওয়া ও বিক্রয়, গাছ লাগানো, পরিবার ছোট রাখা, খরচ কমানো ও সঞ্চয় বৃদ্ধি করা, নিজ স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, পরিবেশকে দূষণমূক্ত রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত পিট-যুক্ত পায়খানা তৈরি ও ব্যবহার, আর্সেনিকমুক্ত নলকূপের অথবা সিদ্ধ পানি পান করা, বাল্যবিবাহ পরিহার, যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া পরিত্যাগ করা, অন্যের প্রতি অন্যায় অবিচার করা থেকে বিরত থাকা, সমষ্টিগত ও বৃহৎ বিনিয়োগ হাতে নেওয়া, পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করা, কোনো সদস্য কর্তৃক নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ করা হলে তার বিহিত করা, প্রতি কেন্দ্রে শৃঙ্খলার ব্যবস্থা করা এবং সর্বপ্রকার সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার শিক্ষা প্রদান করে।

প্রক্রিয়াকরণ ও উৎপাদন, কৃষি ও বনায়ন, সেবা খাত, ব্যবসায়, রিকশা ও রিকশাভ্যান চালানো, মুদি মালের ব্যবসায় ইত্যাদি কাজের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণ প্রদান করে। এ সকল প্রধান খাতের অধীনে অসংখ্য আয়বর্ধনকারী কাজের জন্যও ব্যাংকটি ঋণসুবিধা দিয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রকার আমানত লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংকটি ঋণগ্রহিতা সদস্য ও সদস্য বহির্ভূতদের নিকট হতে আমানত সংগ্রহ করে।

২০২১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা ৯.৪৪ মিলিয়ন। যাদের শতকরা ৯৭% ই মহিলা। ব্যাংকটি সারাদেশের ৮১,৬৭৮টি গ্রামে তাদের ঋণসুবিধা প্রদান করছে। যা সমগ্র বাংলাদেশের মোট গ্রামের ৯৩% শতাংশেরও বেশি। ব্যাংকের সাথে যুক্ত পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য, তারা ঐসব পরিবারকের বৃত্তি দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। সাক্ষরতা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষে তারা একটি বৃত্তি প্রোগ্রাম চালু করে যার অধীনে গ্রামীণ ব্যাংক তাদের সদস্যদের শিশুদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। স্কুলের বকেয়া পরিশোধ, স্কুল পর্যায়ে বই এবং স্টেশনারি ক্রয়।

২০১৯ সালে এই বিভাগে পুরষ্কারপ্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬,০০০ শিশু। ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৩৫৭,৩৭৯ জন শিশু এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হয়েছে। প্রোগ্রামের অধীনে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যয়ের পরিমাণ ৬১৬.১২ মিলিয়ন টাকা।গ্রামীণ ব্যাংক সদস্যদের আশ্রয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৮৪ সালে গৃহায়ণ ঋণ স্কিম চালু করে। একটি সাধারণ টিনের চালাবিশিষ্ট ঘর নির্মাণের জন্য লোনের সর্বোচ্চ সীমা হল ৬০,০০০ টাকা। সুদের হার বার্ষিক ৮ শতাংশ, পাঁচ বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য।

২০১৯ সাল পর্যন্ত ২০,৮৯৪ টি বাড়ি নির্মাণের জন্য ৯৫৫.৪৪ মিলিয়ন টাকা প্রদান করা হয়েছে। এটি গৃহনির্মাণ ঋণের মাধ্যমে নির্মিত মোট বাড়ির সংখ্যা ৭৫৫,৮৮৫ এ পৌঁছেছে। জীবন বীমা সুবিধা হিসাবে প্রতি বছর গ্রামীণ ব্যাংকের মৃত ঋণগ্রহীতাদের পরিবারকে ১৪ থেকে ১৬ মিলিয়ন টাকা পর্যন্ত অর্থ প্রদান করা হয়। প্রতিটি পরিবারকে ১৫০০ টাকা প্রদান করা হয়। ২০১৯ সাল নাগাদ মোট ২০৪,৭১৩ ঋণগ্রহীতা মারা গেছে। গ্রামীণ ব্যাংক তাদের পরিবারগুলিকে সম্মিলিতভাবে মোট ৩৫৬.০৩ মিলিয়ন টাকা প্রদান করেছে।। এই জীবন বীমার জন্য পরিবারগুলোকে কোনো প্রকার প্রিমিয়াম দিতে হয়না। গ্রামীণ ব্যাংক ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২ মিলিয়নের অধিক ঋণগ্রহীতাকে টেলিযোগাযোগ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ও মোবাইল ফোন কেনার জন্য ঋণ প্রদান করেছে।

সদস্যদের আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রাম অঞ্চলের মানুষের জন্য করেছে সুন্দর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং সহজ আয়-রোজগারের পথ। বর্তমানে ফ্লেক্সিলোডের মাধ্যমে পল্লীফোনের কার্যক্রম নতুন আঙ্গিকে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চশিক্ষা ঋণ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষাজীবন সম্পন্নকারী বা অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ‘নবীন উদ্যোক্তা ঋণ কর্মসূচি চালু করেছে। ব্যাংকটি সদস্যের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ মোট পাঁচটি খাতে বৃত্তি দিয়ে আসছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩১১ হাজার ১৩১ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৬৪.৮ বিলিয়ন টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

দারিদ্র্য দূরীকরণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রশংসিত এ ব্যাংকটি সম্প্রসারিত ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে ভূমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।

বিশেষায়িত ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্যে উচ্চহারে ঋণ আদায়, ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, দলের সদস্যগণকে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য দলের সদস্যগণ কর্তৃক উদ্বুদ্ধকরণ, নিজস্ব মাঠকর্মী এবং গৃহীত ঋণের যথাযথ ব্যবহার ও ঋণ পরিশোধ-প্রক্রিয়া সরাসরি তত্ত্বাবধান, পরামর্শ-সেবা প্রদান ও নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি সবিশেষ গুরুত্বপুর্ণ। গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিলের প্রধান উৎসগুলির মধ্যে শেয়ার মূলধন, সাধারণ ও অন্যান্য সঞ্চিতি, ব্যাংক কর্তৃক রক্ষিত কিছু বিশেষ তহবিল, সদস্যদের আমানত ও অন্যান্য তহবিলের স্থিতি এবং ব্যাংক ও অন্যান্য বৈদেশিক উৎস থেকে গৃহীত ঋণ উল্লেখযোগ্য।

সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত একজন চেয়ারম্যানসহ ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা পর্ষদ গ্রামীণ ব্যাংকের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত। চেয়ারম্যান ব্যতীত ১১ জন পরিচালকের মধ্যে ৯ জন ব্যাংকটির ঋণ-গ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার কর্তৃক নির্বাচিত সদস্য হয়।

Leave a Comment