আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, জ্বালানি খাতে ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীর প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট একটি “চাপের বাজেট”-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ওঠানামা করায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিনিময় হারেও অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বর্তমান সময়ে সরকারকে এমন একটি বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা একসঙ্গে বিদ্যমান। তাঁর মতে, রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত হারে বৃদ্ধি না পেলে উন্নয়ন ব্যয় ও চলতি ব্যয় নির্বাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান ঋণের বোঝা এবং নতুন ঋণ গ্রহণের সীমিত সক্ষমতা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলছে। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দামের ওঠানামা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং একটি সংস্কারমুখী অর্থনৈতিক রোডম্যাপ হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর আদায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা খাতে লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে। এর ফলে বাজারে চাহিদা কমে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটার ঝুঁকি রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
নিচের সারণিতে আসন্ন বাজেটের প্রধান চাপ ও তার সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হলো—
| চাপের ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| জ্বালানি ব্যয় | আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা | আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ |
| মূল্যস্ফীতি | উচ্চ পর্যায়ে বিদ্যমান | জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস |
| রাজস্ব আহরণ | লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে | বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি ও ঋণনির্ভরতা বাড়া |
| বৈদেশিক মুদ্রা বাজার | অস্থিরতা বিদ্যমান | বিনিময় হার চাপ ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি |
| ঋণ পরিস্থিতি | পূর্ববর্তী ঋণের বোঝা বিদ্যমান | নতুন ঋণ গ্রহণের ওপর চাপ বৃদ্ধি |
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। রাজস্ব খাতে সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা গেলে অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সহনশীলতা গড়ে তুলতে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, আসন্ন অর্থবছরের বাজেট কেবল একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মতো অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
