চৌদ্দ দিনের রেপো সুবিধা বন্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের ব্যাংক খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চৌদ্দ দিনের রেপো সুবিধা আগামী ৩ মে থেকে ধাপে ধাপে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন থেকে কেবল সাত দিনের রেপো সুবিধার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তা পাবে। তবে সংরক্ষণ সংক্রান্ত সময়কালে নিয়ন্ত্রক সংরক্ষণ মান পূরণে সহায়তার জন্য রাতারাতি রেপো সুবিধা চালু থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জারি করা সংশোধিত নির্দেশনায় এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে আটাশ দিনের রেপো সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদি তহবিল ব্যবস্থাপনার সময়সীমা আরও সংকুচিত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে ব্যাংকগুলো তারল্য পূর্বাভাস ও ব্যবস্থাপনায় আরও দায়িত্বশীল হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমবে।

সংশোধিত রেপো কাঠামো

বৈশিষ্ট্যপূর্ববর্তী ব্যবস্থা৩ মে থেকে কার্যকর
প্রাপ্য মেয়াদরাতারাতি, ৭ দিন, ১৪ দিনরাতারাতি (সংরক্ষণকাল), ৭ দিন
২৮ দিনের রেপোগত বছরের এপ্রিল থেকে বন্ধপ্রযোজ্য নয়
জামানত মূল্যায়নবাজারমূল্যবাজারমূল্যের ৫ শতাংশ কর্তন সাপেক্ষে
খেলাপি জরিমানানির্ধারিত রেপো হাররেপো হার সমপরিমাণ অতিরিক্ত জরিমানা

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, রেপোর বিপরীতে জমা দেওয়া সিকিউরিটিজের বাজারমূল্যের ওপর পাঁচ শতাংশ কর্তন প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক যদি একশ টাকা সমমূল্যের সিকিউরিটিজ জমা দেয়, তবে সে পাবে পঁচানব্বই টাকা সমপরিমাণ তারল্য।

রেপো মেয়াদ শেষে অর্থ পরিশোধে কোনো ব্যাংক সমস্যায় পড়লে সাত দিনের জন্য পুনঃনবায়নের আবেদন করতে পারবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পুরো ঋণ মেয়াদের জন্য রেপো হারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হবে। বর্তমানে রেপো হার দশ শতাংশ হওয়ায়, খেলাপি হলে কার্যত মোট ব্যয় দাঁড়াবে বিশ শতাংশে।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন মেয়াদের রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো মোট ৮২৮ বিলিয়ন টাকা ধার নিয়েছে। এর মধ্যে ৬৩২ বিলিয়ন টাকা—অর্থাৎ মোটের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি—চৌদ্দ দিনের রেপো সুবিধার আওতায় নেওয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভর তারল্য ব্যবস্থাপনার প্রবণতা কতটা বিস্তৃত ছিল।

ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। ফলে রেপো সুবিধা সীমিত করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে বাজারভিত্তিক তহবিল সংগ্রহকে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে আন্তঃব্যাংক কলমানি ও রেপো বাজারে সক্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কঠোর এই নীতিমালা ব্যাংকগুলোকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষ ও সতর্ক করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভরশীল মুদ্রাবাজার গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

Leave a Comment