চ্যালেঞ্জপূর্ণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার ওঠানামা এবং বিনিয়োগ ঝুঁকির চাপের মধ্যেও ২০২৫ সালে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আর্থিক সাফল্য অর্জন করেছে সিটি ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটি সমন্বিত নিট মুনাফা হিসেবে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ব্যাংকটির শক্তিশালী ব্যবসায়িক কৌশল, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় আয়ের উৎসের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকের একক নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। সহযোগী চারটি প্রতিষ্ঠানের অবদান হিসেবে আরও ১৮ কোটি টাকা যুক্ত হয়ে মোট সমন্বিত মুনাফা নতুন রেকর্ড গড়ে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মতে, মূলত তিনটি খাত এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে—সুদ আয় বৃদ্ধি, ফি ও কমিশন আয়ের সম্প্রসারণ এবং সরকারি সিকিউরিটিজে কৌশলগত বিনিয়োগ।
Table of Contents
সিটি ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রধান আর্থিক সূচক
| সূচক | ২০২৫ সালের ফলাফল | পূর্ববর্তী অবস্থা |
|---|---|---|
| সমন্বিত নিট মুনাফা | ১,৩২৪ কোটি টাকা | ৩১% প্রবৃদ্ধি |
| একক নিট মুনাফা | ১,৩০৬ কোটি টাকা | বৃদ্ধি পেয়েছে |
| সুদ আয় | ৫,৪৫২ কোটি টাকা | ৪,৪০৩ কোটি টাকা |
| মোট পরিচালন আয় | ৪,৮৮৮ কোটি টাকা | বৃদ্ধি পেয়েছে |
| ফি ও কমিশন আয় | ৯৯৭ কোটি টাকা | মোট আয়ের ২১% |
| প্রভিশন ব্যয় | ৮১৫ কোটি টাকা | ৬২৮ কোটি টাকা |
| ব্যয়-আয় অনুপাত | ৪৪ শতাংশ | স্থিতিশীল |
| এনপিএল হার | ২.৫ শতাংশ | ৩.৭% থেকে কমেছে |
সুদ আয় ও বিনিয়োগ কৌশলে অগ্রগতি
২০২৫ সালে ব্যাংকের সুদ আয় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। উচ্চ সুদহার পরিবেশ, ঋণ বিতরণ বৃদ্ধির গতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ির ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকটি সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তহবিল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রেখেছে। মোট ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার পরিচালন আয়ের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ এসেছে এই বিনিয়োগ খাত থেকে। তহবিল ব্যয় সমন্বয়ের পর নিট বিনিয়োগ আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা।
ফি ও কমিশন আয়ের বিস্তৃতি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ৮.০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ট্রেড ব্যবসা সম্পন্ন করেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে অন্যতম বৃহৎ অর্জন।
এর মাধ্যমে ট্রেড সার্ভিস থেকে আয় হয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি রিটেইল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং খাত থেকে এসেছে আরও ৪৭১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ফি ও কমিশন আয় দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
মুদ্রাস্ফীতি এবং নতুন বেতন কাঠামোর চাপ সত্ত্বেও ব্যাংকটি ব্যয়-আয় অনুপাত ৪৪ শতাংশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মোট আয়ের ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা, যা দক্ষ অপারেশনাল ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
তবে ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে প্রভিশন ব্যয় বাড়িয়ে ৮১৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে প্রভিশন কভারেজ অনুপাত বেড়ে ১২৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, উচ্চ প্রভিশন ব্যয়ের কারণে মুনাফা ১,৫০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করতে পারেনি, তবে ব্যাংকের মূল ব্যবসায়িক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসা কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ের চেয়েও বেশি আয় করছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। পাশাপাশি ছোট ব্যবসা, ন্যানো ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড পোর্টফোলিওর মানও সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও সিটি ব্যাংকের এই রেকর্ড মুনাফা শুধু একটি আর্থিক অর্জন নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক ব্যাংকিং কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ব্যাংকটি আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছাবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
