জাতির লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধারে জটিলতা ও কূটনৈতিক বাধা

দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার উদ্যোগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিল। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক ও তাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন এক কাজ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যবিশিষ্ট আন্তঃসংস্থার টাস্কফোর্সসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

শুধু কাজের জটিলতা নয়, এই বিষয়ে সরকারের অভিজ্ঞতার অভাবও বড় একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার এই পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদেশে পালিয়ে থাকা বাংলাদেশি ধনকুবেরদের সম্পর্কে তথ্য পেতে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমএলএ) চেয়ে অনুরোধ করলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বরং আরও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে, কোনো কার্যকর তথ্য দেয়নি।

স্বীকার করতেই হবে, এসব জটিলতার মূল কারণ বিদেশি কর্তৃপক্ষের অনিচ্ছা নয়, বরং এমএলএ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতার অভাব। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এ বিষয়ে প্রচেষ্টা চললেও ফলাফল হতাশাজনক। স্পষ্টতই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এমএলএ কাঠামো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা বিদেশি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন।

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের জটিলতা চুরি হওয়া সম্পদ ফেরত আনার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদালত-আদেশে স্থগিত অ্যাকাউন্ট থেকে কর আদায়ের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে, কারণ বিপরীত পক্ষ আদালতে পাল্টা মামলা করেছে। ফলে, সরকারের হাতে অফিসে মাত্র এক-দুই মাস বাকি থাকায় দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সরকার আদালতের বাইরে সমঝোতার পথেও যেতে রাজি নয়।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অগ্রাধিকার হলো স্থগিত অ্যাকাউন্টগুলোর অর্থ উদ্ধার করা। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আইনি সহায়তা নেওয়ার জন্য আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এসব আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষর করতে হবে। যদিও এই পদক্ষেপটি দেরিতে নেওয়া হয়েছে, তবু এটি কিছু ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তবে এই প্রচেষ্টার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী নির্বাচিত সরকার এই উদ্যোগ কতটা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে তার উপর।

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বলা চলে, শেখার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে—প্রাক্তন স্বৈরাচারী শাসক ও তাদের ঘনিষ্ঠদের বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের কঠিন কাজটি সম্পাদনের চেষ্টায়। এরা অর্থ ও প্রভাব দুই-ই ব্যবহার করে বিদেশে তাদের সম্পদ গোপন করতে দক্ষ আর্থিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে সক্ষম।

গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য পত্রিকা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস প্রকাশিত বাংলাদেশের চুরি হওয়া বিলিয়ন ডলার শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে এই দুর্নীতির গভীরতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুর্নীতির মাত্রা “অন্য কোথাও দেখা যায়নি”—এবং অর্থ ফেরতের পথে যে বিরাট বাধা রয়েছে, বিশেষত যারা অর্থ চুরি করেছে তাদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে সামান্য কিছু অগ্রগতির খবরও পাওয়া গেছে। প্রাক্তন সরকারের এক পলাতক মন্ত্রীর সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে একজন প্রশাসক নিয়োগ করেছে। তবুও সামগ্রিকভাবে, এই প্রক্রিয়ায় সাফল্য অর্জন এখনো অনেক দূরের পথ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তত এমন একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে যেতে পারে, যার উপর পরবর্তী সরকার দেশের লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধারের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আরও কার্যকরভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।

Leave a Comment