জাহাজনির্মাণ শিল্পে ঋণ নবায়নে বিশাল ছাড় দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের উদীয়মান নীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু-ইকোনমি’র অন্যতম প্রাণশক্তি জাহাজনির্মাণ শিল্পকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে এক বিশেষ ঋণ পুনঃ তফসিল নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি, ২০২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, রপ্তানিমুখী ও স্থানীয় জাহাজনির্মাণ শিল্পের উদ্যোক্তারা এখন থেকে মাত্র ১.৫ শতাংশ প্রাথমিক ডাউনপেমেন্ট জমা দিয়ে তাঁদের খেলাপি ঋণ নবায়ন করতে পারবেন। এই নজিরবিহীন সুবিধার ফলে সংকটাপন্ন শিপইয়ার্ডগুলো পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন এই বিশেষ নীতিমালা?

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জাহাজনির্মাণ শিল্প একটি অত্যন্ত মূলধন নিবিড় ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্র। বর্তমানে ইউরোপে চলমান সামরিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (Supply Chain) বিঘ্ন ঘটার কারণে এই খাতের নগদ প্রবাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। যেহেতু এই নেতিবাচক পরিস্থিতি উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এবং এই শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই শিথিল নীতি গ্রহণ করেছে।

পুনঃ তফসিল সুবিধার বিস্তারিত শর্তাবলি

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত জাহাজনির্মাণ খাতের যে সকল ঋণ শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়েছে, সেগুলো পুনঃ তফসিলের আওতায় আসবে। উদ্যোক্তাদের জন্য কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা এবং এককালীন জমার ক্ষেত্রে ব্যাপক নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।

জাহাজনির্মাণ শিল্পের বিশেষ ঋণ সুবিধা একনজরে:

সুবিধার ধরণবিস্তারিত শর্তাবলি
ডাউনপেমেন্ট (আবেদনের সময়)মোট বকেয়া ঋণের মাত্র ১.৫ শতাংশ।
অবশিষ্ট ডাউনপেমেন্টবাকি ১.৫ শতাংশ (কার্যকরের পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে)।
ঋণ পরিশোধের মেয়াদসর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ মেয়াদী কিস্তি।
পরিশোধে বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড)প্রথম ২ বছর (মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না)।
সুদ ব্যবস্থাপনাস্থগিত ও অনারোপিত সুদ পৃথক ‘ব্লকড’ অ্যাকাউন্টে থাকবে।
আবেদনের শেষ তারিখ৩০ জুন, ২০২৬।

গ্রেস পিরিয়ড ও নতুন ঋণ গ্রহণের সুযোগ

এই নীতিমালার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো টানা দুই বছরের ‘গ্রেস পিরিয়ড’। এই ২৪ মাস উদ্যোক্তাদের ঋণের আসল টাকা পরিশোধ করতে হবে না, যা তাঁদের ব্যবসার পুঁজি বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্যবস্থাপনায় বড় সহায়তা দেবে। তবে গ্রেস পিরিয়ড চলাকালীন ঋণের বিপরীতে আরোপিত সুদ নিয়মিতভাবে পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া, এই সুবিধার আওতায় ঋণ নবায়ন করা হলে নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত ‘কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট’ জমা দিতে হবে না।

নজরদারি ও কঠোরতা

কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই বিশেষ সুবিধা কেবল সৎ ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য।

  • ইচ্ছাকৃত খেলাপি: যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছেন না, তারা এই সুবিধার বাইরে থাকবেন।

  • জাল-জালিয়াতি: প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা কার্যকর হবে না।

  • বিশেষ পরিদর্শন: ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে গ্রাহক আসলেই বৈশ্বিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

  • ব্যর্থতার পরিণাম: যদি কোনো উদ্যোক্তা পুনঃ তফসিলের পর কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তবে তিনি চিরতরে এই সুবিধা হারাবেন এবং ঋণটি সরাসরি খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে।

উপসংহার

জাহাজনির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিগত ছাড় দেশের রপ্তানি আয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আবেদনের সুযোগ গ্রহণ করে অনেক মৃতপ্রায় শিপইয়ার্ড পুনরায় কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে। এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ কেবল শিল্পপতিদেরই নয়, বরং এই খাতের সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার দক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করবে।

Leave a Comment