ঝুঁকিভিত্তিক প্রিমিয়াম আনছে ভারত

ভারতে ব্যাংক আমানতের বিমা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা সমহারে প্রিমিয়াম পরিশোধের প্রথা বাতিল করে এবার থেকে ব্যাংকের ঝুঁকিপ্রোফাইল অনুযায়ী বিমা প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হবে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে এই নতুন ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামো কার্যকর হবে, যা বাস্তবায়ন করবে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ক্রেডিট গ্যারান্টি করপোরেশন (ডিআইসিজিসি)। উদ্দেশ্য একটাই—ভালো ঝুঁকিব্যবস্থাপনায় দক্ষ ব্যাংকগুলোকে কম প্রিমিয়ামের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা এবং দুর্বল ঝুঁকিনিয়ন্ত্রণকারী ব্যাংকগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি দায় চাপানো।

১৯৬২ সাল থেকে ভারতীয় ব্যাংকগুলো আমানত বিমার জন্য সমহারে প্রিমিয়াম দিয়ে আসছে। বর্তমানে এই হার প্রতি ১০০ রুপি আমানতের বিপরীতে ১২ পয়সা। পদ্ধতিটি প্রশাসনিকভাবে সহজ হলেও ঝুঁকিব্যবস্থাপনায় পার্থক্যকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে কোনো বিভাজন করত না। ফলে সুস্থ ব্যাংক ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক—উভয়ের ওপরই সমান বোঝা পড়ত। নতুন কাঠামোতে এই বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরবিআইয়ের ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা, সম্পদের গুণগত মান, আয়ক্ষমতা, তারল্য পরিস্থিতি এবং কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে আমানত বিমা তহবিলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ—এসব সূচক বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত ঝুঁকির স্তরের ভিত্তিতে প্রিমিয়ামে ছাড় বা বাড়তি হার আরোপ হবে। তবে অতিরিক্ত প্রণোদনা বা শাস্তির সীমা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যাতে প্রিমিয়ামের ওঠানামা অত্যধিক না হয়।

নতুন কাঠামোয় দুই স্তরের ঝুঁকিমূল্যায়ন মডেল চালু হচ্ছে। নির্ধারিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য (আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক ব্যতীত) প্রযোজ্য হবে টিয়ার–১ মডেল। অন্যদিকে আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক ও সমবায় ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য হবে টিয়ার–২ মডেল। তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে পেমেন্টস ব্যাংক ও লোকাল এরিয়া ব্যাংক আপাতত বিদ্যমান সমহারে প্রিমিয়ামই দেবে। শহুরে সমবায় ব্যাংকগুলো যদি তদারকি বা সংশোধনমূলক বিধিনিষেধের আওতায় থাকে, সেগুলো ওই বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে এলে তবেই নতুন কাঠামোর আওতায় আসবে।

প্রিমিয়াম সমন্বয়ে দুটি প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, ঝুঁকিভিত্তিক প্রণোদনা—যা বিদ্যমান কার্ড রেটের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৩.৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কম-বেশি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ‘ভিনটেজ’ প্রণোদনা—দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের দাবি ছাড়াই আমানত বিমা তহবিলে নিয়মিত অবদান রাখা ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পেতে পারে। চূড়ান্ত প্রিমিয়াম নির্ধারণে এই দুই প্রণোদনা একত্রে বিবেচিত হবে।

নতুন কাঠামো কার্যকর হলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিনিয়ন্ত্রণে আরও মনোযোগী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আমানত বিমা তহবিলের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে তহবিলের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম পড়বে।

নতুন ঝুঁকিভিত্তিক প্রিমিয়াম কাঠামোর সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়পুরোনো ব্যবস্থানতুন ব্যবস্থা
প্রিমিয়াম হারসবার জন্য সমান (১২ পয়সা/১০০ রুপি)ঝুঁকির ভিত্তিতে কম-বেশি
কার্যকর সময়১৯৬২ থেকে১ এপ্রিল থেকে
মূল্যায়নের সূচকপ্রযোজ্য নয়মূলধন, সম্পদ, আয়, তারল্য, সম্ভাব্য ক্ষতি
মডেলএকক ব্যবস্থাটিয়ার–১ ও টিয়ার–২
সর্বোচ্চ ছাড়/বাড়তি হারনেইঝুঁকিভিত্তিক সর্বোচ্চ ±৩৩.৩৩%
ভিনটেজ প্রণোদনানেইসর্বোচ্চ ২৫% ছাড়

এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে ভারতের ব্যাংক খাত আরও দায়িত্বশীল ও ঝুঁকিসচেতন পথে এগোবে বলে নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা।

Leave a Comment