টাকার বিষয়ে যা আমাদের শেখানো হয়নি কিন্তু জানা জরুরী

আমরা বই-খাতা নিয়ে স্কুল–কলেজে যাই মূলত লেখাপড়া ও জ্ঞানার্জনের জন্য। কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রায়ই শুনি— “লেখাপড়া না করলে খাবি কী করে?” অর্থাৎ আমাদের শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় টাকা উপার্জন

মজার বিষয় হলো—ভাষা, গণিত, বিজ্ঞানসহ অসংখ্য বিষয় আমরা পড়ি ভবিষ্যতে অর্থ রোজগারের জন্য, অথচ সেই টাকা কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, তা নিয়ে আমাদের পাঠ্যক্রমে নেই দুই পাতা লেখাও। নেই কোনো ব্যবহারিক ক্লাস, নেই কোনো প্রজেক্ট বা অ্যাসাইনমেন্ট।

ফলে বৈপরীত্য দাঁড়ায়—
যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করি, সেই টাকার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমরা বাস্তবে খুব কমই শিখতে পারি।

টাকা কীভাবে কাজ করে, কীভাবে বাড়ানো যায়, কীভাবে রক্ষা করতে হয়, আর কীভাবে ভুল সিদ্ধান্তে হারিয়ে যায়—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কখনও পড়ানো হয়নি। অথচ টাকা আমাদের প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত, জীবনযাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি।

ঈষৎ বিস্ময়ের বিষয়—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আর্থিক পাঠ কখনও আলোচনা করা হয় না। ফলে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়, সঠিকভাবে সঞ্চয় করতে পারে না, কিংবা ব্যাংক কীভাবে কাজ করে তা ভুলভাবে বুঝে ফেলে।

এ লেখায় আমরা এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সত্য তুলে ধরছি, যেগুলো জানলে আপনি আপনার আয়, সঞ্চয়, ব্যয় ও বিনিয়োগ সম্পর্কে আরও সচেতন ও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

১. ব্যাংক আপনার আর্থিক পরামর্শদাতা নয়

বেশিরভাগ মানুষ মনে করে ব্যাংক তাদের উপকারের জন্য উপদেশ দেয়। বাস্তবে ব্যাংক একটি মুনাফাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের কর্মীদের প্রশিক্ষিত করা হয় ব্যাংকের পণ্যের প্রচারে—আপনার ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।

ব্যাংকের আয় আসে:

  • ঋণের সুদ
  • ক্রেডিট কার্ড ফি
  • বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ
  • বীমা/বিনিয়োগ পণ্যের ক্রস-সেলিং
  • লেনদেন চার্জ

অতএব ব্যাংক সবসময় আপনার প্রয়োজনের সাথে সবচেয়ে মানানসই পণ্য দেয়—এমন নয়। ব্যাংকের ব্যবসায়িক লক্ষ্যই তাদের মূল অগ্রাধিকার।

মূল শিক্ষা:
বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবসময় স্বাধীন পরামর্শ নিন। আপনার লক্ষ্য, ঝুঁকি সহনশীলতা ও জীবনযাত্রা—সব মিলিয়ে আপনার জন্য ব্যাংকের প্রস্তাবের চেয়ে ভিন্ন সমাধান প্রয়োজন হতে পারে।

২. শুধু সঞ্চয় করে ধনী হওয়া যায় না

আমরা সঞ্চয়কে অর্থনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি মনে করি। সঞ্চয় অবশ্যই জরুরি, কিন্তু শুধু সঞ্চয় করে কখনও ধনী হওয়া যায় না।

কারণ—সময় যত যায়, মুদ্রাস্ফীতির কারণে টাকার মূল্য কমে

ধরা যাক—

  • মুদ্রাস্ফীতি ৭%
  • আপনার ব্যাংক সঞ্চয়ে সুদ ৪%
  • বাস্তবে আপনার টাকার মূল্য কমছে ৩%

অতএব শুধু সঞ্চয় করে টাকা জমিয়ে রাখা হলো “স্থির অবস্থায় থেকে ধীরে ধীরে ক্ষতি”।

সত্যিকার সম্পদ গড়ে ওঠে—

  • বিনিয়োগে
  • ব্যবসায়
  • জমি/সম্পত্তিতে
  • দক্ষতা উন্নয়নে (আয় বাড়াতে)

সঞ্চয় আপনার টাকা “রক্ষা” করে, বিনিয়োগ তা “বাড়ায়”।

৩. আপনার আয় নয়—ক্রেডিট রেকর্ডই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

আজকের আর্থিক ব্যবস্থায় আপনার CIB রিপোর্ট (ক্রেডিট ইতিহাস) অনেক সময় আপনার বেতনের থেকেও বেশি মূল্যবান।

একজন উচ্চ বেতনের ব্যক্তি যদি ঋণখেলাপি হন, তবে তিনি উচ্চ ঝুঁকির গ্রাহক। অন্যদিকে মাঝারি আয়ের একজন গ্রাহক যদি ভালো পরিশোধ ইতিহাস রাখেন, তাকে ব্যাংক বেশি মূল্য দেয়।

খারাপ ক্রেডিট রেকর্ড সীমাবদ্ধ করে—

  • হোম লোন
  • গাড়ির লোন
  • ক্রেডিট কার্ড
  • ব্যবসায়ী ঋণ
  • কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ
  • এমনকি কিছু পেশায় চাকরির সুযোগও

মূল শিক্ষা:
সময়মতো সব দেনা পরিশোধ করুন এবং ব্যাংকিং আচরণ পরিষ্কার রাখুন। ভালো ক্রেডিট রেকর্ড হলো অমূল্য সম্পদ।

৪. “জিরো ফি” অ্যাকাউন্ট—আসলে খুব কমই সত্যিকারের জিরো ফি

বিজ্ঞাপনে ব্যাংক লিখে—

  • জিরো ব্যালান্স
  • জিরো চার্জ
  • জিরো ফি

কিন্তু বাস্তবে থাকে—

  • লুকানো ট্রানজ্যাকশন ফি
  • এটিএম চার্জ
  • কার্ড রিপ্লেসমেন্ট ফি
  • মাসিক সার্ভিস চার্জ
  • সীমিত ফ্রি লেনদেন
  • এসএমএস চার্জ

“জিরো ফি” সাধারণত মার্কেটিং টার্ম।

যা অবশ্যই যাচাই করবেন:

  • বিস্তারিত চার্জ তালিকা
  • দৈনিক/মাসিক ফ্রি লেনদেন সীমা
  • সীমা অতিক্রম করলে জরিমানা
  • কার্ড/এটিএম/ডিজিটাল সার্ভিস চার্জ

এ সামান্য সচেতনতা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝামেলা কমায়।

৫. ব্যাংক সবসময় ঋণ দেয় তাদেরকেই যারা ঋণের প্রয়োজন কম

হ্যাঁ, শুনতে অদ্ভুত লাগে—
কিন্তু ব্যাংক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে ঋণ দেয়।

যাদের—

  • আয় স্থায়ী
  • সম্পদ আছে
  • কম দেনা
  • ভালো ব্যাংকিং ইতিহাস
  • পরিষ্কার ক্রেডিট রিপোর্ট

তাদেরকে ব্যাংক “নিরাপদ গ্রাহক” মনে করে।

আর যাদের খুব প্রয়োজন—তাদের অবস্থায় সচরাচর থাকে—

  • দুর্বল ক্রেডিট স্কোর
  • অস্থির আয়
  • আগের খেলাপি
  • সীমিত সম্পদ

ফল: ব্যাংক তাদেরকে কম পছন্দ করে।

মূল শিক্ষা:
ঋণের আবেদন করার আগে নিজের আর্থিক প্রোফাইল শক্তিশালী করুন।

৬. যত তাড়াতাড়ি বিনিয়োগ শুরু করবেন, ততই লাভবান হবেন

টাকার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো চক্রবৃদ্ধি মুনাফা (compound growth)। কম পরিমাণ হলেও, বেশি সময় ধরে বিনিয়োগ করলে টাকা বহুগুণ বাড়ে।

দু’জন বিনিয়োগকারীকে দেখা যাক:

বিনিয়োগকারীবয়সে শুরুমাসিক বিনিয়োগথামলেনমোট বিনিয়োগ৬০ বছরে মূল্য (১০% হারে)
A২৫£100৩৫£12,000£380,000+
B৩৫£100৬০£30,000£210,000+

এখানে দেখা যাচ্ছে—
A কম টাকা বিনিয়োগ করেও বেশি লাভ করেছে, কারণ সে আগে শুরু করেছে।

শিক্ষা:
ছোট পরিমাণ দিয়ে শুরু করুন—কিন্তু শুরু করুন এখনই

এই অজানা আর্থিক পাঠগুলো আপনার জীবন বদলে দিতে পারে

অধিকাংশ মানুষ টাকার বিষয়ে শিক্ষা পায় ভুল করে, ক্ষতি করে বা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।
কিন্তু এই ছয়টি মূলনীতি জানলে আপনি অনেক সাধারণ ভুল সহজেই এড়াতে পারবেন—

  • ব্যাংককে পরামর্শদাতা ভাবা
  • শুধু সঞ্চয়েই ভরসা রাখা
  • ক্রেডিট রিপোর্টকে গুরুত্ব না দেওয়া
  • জিরো ফি অফারের ফাঁদে পড়া
  • আর্থিক অস্থিরতা রেখে ঋণ নেওয়া
  • দেরিতে বিনিয়োগ শুরু করা

এসব ভুল থেকে দূরে থাকলে আপনার আর্থিক যাত্রা হবে অনেক স্থিতিশীল ও সুরক্ষিত।

Leave a Comment