দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যখন নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আশার আলো দেখাচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। মাসের মাত্র ২৯ দিনেই প্রবাসীরা বৈধ পথে ৩ বিলিয়ন ৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে) যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একক মাসের হিসেবে এটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ওপর প্রবাসীদের আস্থা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় এবারের প্রবৃদ্ধি বিস্ময়কর। গত বছর এই সময়ে যেখানে ২৪২ কোটি ১০ লাখ ডলার এসেছিল, এবার সেখানে ২৮ দিনেই এসেছে ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের মতে, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের উৎসাহ এবং ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার প্রবাসীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ গত বছরের সকল রেকর্ডকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। জুলাই থেকে ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ পর্যন্ত সংগৃহীত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অংকের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭.৭ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনামূলক চিত্র
| মাস (২০২৫) | রেমিট্যান্সের পরিমাণ (মিলিয়ন ডলার) | মাসিক বৈশিষ্ট্য |
| জুলাই | ২৪৭৭.৮ | অর্থবছরের শক্তিশালী সূচনা |
| আগস্ট | ২৪২১.৯ | স্থিতিশীল প্রবাহ |
| সেপ্টেম্বর | ২৬৮৫.৮ | উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| অক্টোবর | ২৫৬৩.৫ | স্বাভাবিক গতি |
| নভেম্বর | ২৮৮৯.৫ | ৩ বিলিয়নের দোরগোড়ায় |
| ডিসেম্বর (২৯ তারিখ পর্যন্ত) | ৩০৪১.০ | ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ |
| মোট (জুলাই – ২৮ ডিসেম্বর) | ১৬,০৭৯.০ | বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৭.৭% |
উল্লেখ্য যে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রেকর্ড ৩.২৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা এখন পর্যন্ত এক মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। তবে কোনো উৎসব ছাড়াই ডিসেম্বরের এই বিপুল পরিমাণ আয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং আমদানি দায় মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ডিসেম্বরের ৬ তারিখ পর্যন্ত ১৩৬ কোটি ১০ লাখ ডলার এসেছিল, যা গত বছরের তুলনায় ১৬.৫ শতাংশ বেশি ছিল। কিন্তু মাসের শেষভাগে এসে এই প্রবাহ আরও তীব্র হয়েছে। মূলত হুন্ডি প্রতিরোধে কড়াকড়ি এবং প্রবাসীদের সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করার কারণেই এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
