তফসিলি ব্যাংকে নারীবান্ধব ও আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিতের নির্দেশ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের জন্য কর্মপরিবেশ এবং সেবার মান উন্নত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপশাখা পর্যন্ত সর্বত্র নারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি, ২০২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে সকল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে পাঠানো হয়েছে।

নির্দেশনার প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা

বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীবাহিনীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যাংকগুলোতে নারী গ্রাহকদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। তবে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, অনেক ব্যাংক শাখায় নারীদের জন্য পৃথক বা স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম নেই। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে নারী কর্মকর্তারা দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগেন এবং নারী গ্রাহকরাও সেবা নিতে এসে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন। এই বাস্তবতার নিরিখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নারীর মর্যাদা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার মূল বিষয়গুলো নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:

ব্যাংকিং খাতে নারীবান্ধব স্যানিটেশন ব্যবস্থার আবশ্যিক শর্তাবলী

ক্রমানুসারনির্দেশনার ক্ষেত্রবিস্তারিত রূপরেখা ও লক্ষ্য
ভৌগোলিক পরিধিপ্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয় এবং সকল শাখা ও উপশাখা।
প্রবেশ ও নিরাপত্তানারী কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও নিরাপদ প্রবেশপথ।
স্যানিটারি সামগ্রীপর্যাপ্ত পানি, উন্নত সাবান, হ্যান্ডওয়াশ ও আধুনিক স্যানিটেশন সরঞ্জাম।
অবকাঠামো সংস্কারজরাজীর্ণ ওয়াশরুমগুলো দ্রুত সংস্কার এবং স্বাস্থ্যসম্মত আধুনিকায়ন।
পরিচ্ছন্নতা ও তদারকিসার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক প্রভাব

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, কর্মক্ষেত্রে বা পাবলিক প্লেসে মানসম্মত ওয়াশরুমের অভাব নারীদের দীর্ঘমেয়াদী কিডনি সমস্যা ও ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (UTI) প্রধান কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের ফলে নারী কর্মীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থেকে দাপ্তরিক কাজে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে পারবেন। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোতে যাতায়াতকারী নারী গ্রাহকদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করবে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির (Financial Inclusion) হার বাড়াতে সহায়ক হবে।

বাস্তবায়ন ও নজরদারি

সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, যেসব ব্যাংকে বর্তমানে পর্যাপ্ত ওয়াশরুম নেই বা বিদ্যমানগুলোর অবস্থা শোচনীয়, তাদের অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে অভ্যন্তরীণ অডিট বা নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এই নির্দেশের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নির্দেশনার সফল বাস্তবায়ন কেবল ব্যাংকিং খাতের কর্মপরিবেশই পরিবর্তন করবে না, বরং দেশের করপোরেট সংস্কৃতিতে নারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে নারী অধিকার কর্মী এবং ব্যাংকিং খাতের পেশাজীবীরা স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জেন্ডার-সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ গড়ার ক্ষেত্রে এটি একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও সাহসী পদক্ষেপ।

Leave a Comment