বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। কিছু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে উন্নতির আভাস থাকলেও, বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন নেই। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব এবং ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন ধস—সব মিলিয়ে দেশ এক গভীর কাঠামোগত সংকটে নিমজ্জিত। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি বনাম প্রকৃত মজুরি: পরিসংখ্যানের আড়ালে ধুঁকছে মানুষ
সরকারি তথ্যমতে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের ১১.৩৮ শতাংশের তুলনায় কিছুটা সহনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান বাজারে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ একই সময়ে মানুষের মজুরি প্রবৃদ্ধি কমে ৮.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে ব্যয় বাড়ছে অনেক বেশি দ্রুতগতিতে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে তাদের জীবনযাত্রার মানে।
দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতির তুলনামূলক পরিসংখ্যান:
| অর্থনৈতিক সূচকসমূহ | ২০২৪ সালের চিত্র | ২০২৫ সালের চিত্র | পরিস্থিতির মূল্যায়ন |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ১,৯৯৫ কোটি ডলার | ২,৭৮৮ কোটি ডলার | বৈদেশিক খাতে আস্থার সঞ্চার। |
| খেলাপি ঋণের পরিমাণ | ২.১১ লাখ কোটি টাকা | ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা | ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ ধস। |
| খেলাপি ঋণের হার (%) | ১২.৫% | ৩৫.৭৩% | আমানতকারীদের জন্য চরম ঝুঁকি। |
| বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ | প্রায় ৯% | ৬.২৩% | বিনিয়োগে ঐতিহাসিক স্থবিরতা। |
| তরুণ বেকারত্ব (NEET) | ১৮% (প্রায়) | ২০% এর বেশি | উচ্চ শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান সংকট। |
ব্যাংকিং খাতের ধ্বংসস্তূপ ও বিনিয়োগে আস্থার অভাব
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত এখন ব্যাংকিং খাতে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলো এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। আমানতকারীদের আস্থা এতটাই কমেছে যে, ব্যাংক থেকে টাকা তোলার চাপে অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগে। অক্টোবর ২০২৫-এ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ৬.২৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদের মতে, উচ্চ সুদের হার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে বেশি চিন্তিত। এতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দেবে।
কর্মসংস্থান ও তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিনিয়োগ মন্দার সবচেয়ে বড় কুফল হিসেবে দেখা দিয়েছে কর্মসংস্থান সংকট। আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরি সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের একটি বড় অংশ আজ শিক্ষা বা কাজের বাইরে রয়েছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২-২৩ শতাংশে আটকে থাকায় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। যথাযথ কর্মসংস্থান না হওয়া তরুণদের মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা ও হাতাশা তৈরি করছে।
উত্তরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ
ডলার সংকট মোকাবিলা ও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অন্তর্বর্তী সরকার সফল হলেও অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফেরানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব এবং দুর্বল কর ব্যবস্থার কারণে অর্থনীতিতে গতি ফিরছে না। দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে ব্যাংকিং খাতের শক্ত সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরানোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
