দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় লাফ: ছাড়ালো ৩৫ বিলিয়ন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বইছে। দীর্ঘ প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তথা গ্রস মজুত আবারও ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। আজ মঙ্গলবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫.০৪ বিলিয়ন ডলার। এর আগে সর্বশেষ ২০২০ সালের জুন মাসে করোনা মহামারিকালীন সময়ে হুন্ডি বন্ধ ও প্রবাসী আয় বাড়ার ফলে রিজার্ভ এই উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থ পাচার রোধে কঠোর অবস্থান এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি এই অর্জনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।


রিজার্ভ বাড়ার নেপথ্য কারণ ও প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত কয়েক বছর ধরে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় রিজার্ভে ধস নেমেছিল। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ থাকলেও পরবর্তীতে তা দ্রুত কমতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় রিজার্ভ নেমে এসেছিল ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলারে।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান নির্বাচিত সরকার ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং প্রবাসী আয় বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। বিশেষ করে হুন্ডি প্রতিরোধে কড়াকড়ি এবং ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহ প্রদান করায় ডলারের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের তুলনামূলক পরিসংখ্যান

নিচে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সাম্প্রতিক রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

সময়কাল/বিবরণগ্রস রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলারে)বিপিএম-৬ মান অনুযায়ী (বিলিয়ন ডলারে)বিশেষ মন্তব্য
আগস্ট ২০২১ (সর্বোচ্চ)৪৮.০০ডলারের দর ছিল ৮৪.২০ টাকা
আগস্ট ২০২৪ (সরকার পতন কাল)২৫.৯২২০.৪৮ডলারের সংকটে আমদানি সীমিত ছিল
জানুয়ারি ২০২৬৩৩.৫০ (প্রায়)২৮.৪০রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৭ কোটি ডলার
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বর্তমান)৩৫.০৪৩০.৩০আইএমএফ-এর কিস্তি ছাড়াই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল ও প্রবাসী আয়ের প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ইতিপূর্বে জানিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি ছাড়াই চলতি অর্থবছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। গভর্নরের সেই পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নিয়েছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ২৩ দিনেই দেশে ২৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩১৭ কোটি ডলার এবং ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার।

প্রবাসী আয়ের এই উল্লম্ফনের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার বড় একটি অংশ কেনা হয়েছে চলতি মাসেই। এটি সরাসরি রিজার্ভের গ্রাফকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও অর্থনীতিবিদদের মত

অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশে নতুন বড় কোনো বিনিয়োগ না থাকায় আমদানির চাপ কিছুটা কম, যা রিজার্ভ বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় এখন শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি অর্থ পাচার পুরোপুরি বন্ধ রাখা যায় এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে ডলারের কোনো সংকট হবে না।

রেমিট্যান্সের এই ধারা অব্যাহত রাখতে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজতর করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য। ৩৫ বিলিয়ন ডলারের এই মাইলফলক বাংলাদেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর একটি শক্তিশালী সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Comment