দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নগদ লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে নতুন এক কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি টাকার কম, তারা তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো ধরনের নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা বা প্রদান করতে পারবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জারি করা এই নতুন নিয়মটি আগামী ২০২৬ অর্থবছর শেষে ঘোষিতব্য লভ্যাংশের ক্ষেত্রে সরাসরি কার্যকর হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা ও লভ্যাংশের সীমা
গত শনিবার দেশের সমস্ত তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন এই প্রজ্ঞাপনে পরিশোধিত মূলধনের সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি নগদ লভ্যাংশ বিতরণের সর্বোচ্চ হারের ওপরও একটি নির্দিষ্ট সীমা বা ক্যাপ আরোপ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যোগ্য ব্যাংকগুলো তাদের ঘোষিত মোট লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ আকারে পরিশোধ করতে পারবে। অর্থাৎ, পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও কোনো ব্যাংক তার মোট ঘোষিত লভ্যাংশের অর্ধেকের বেশি টাকা নগদ দিতে পারবে না, অবশিষ্ট অংশ স্টক বা বোনাস লভ্যাংশ হিসেবে দিতে হবে।
বর্তমানে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকেরই পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি টাকার নিচে রয়েছে। ফলে এই নতুন নির্দেশনার কারণে দেশের সিংহভাগ ব্যাংকের নগদ লভ্যাংশ প্রদানের পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে যাবে। যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই মূলধন শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের নগদ অর্থ বিতরণের পরিবর্তে বোনাস শেয়ার বা স্টক লভ্যাংশ ইস্যু করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিচে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার মূল শর্তসমূহ ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| নির্দেশনার বিষয় ও সূচক | নির্ধারিত সীমা ও শর্তাবলী | কার্যকরের সময়সীমা |
| নগদ লভ্যাংশের জন্য পরিশোধিত মূলধন | সর্বনিম্ন ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি টাকা | ২০২৬ অর্থবছরের শেষ থেকে |
| নগদ লভ্যাংশ বিতরণের সর্বোচ্চ হার | মোট ঘোষিত লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ | ২০২৬ অর্থবছরের শেষ থেকে |
| শর্ত পূরণে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোর করণীয় | নগদ টাকার পরিবর্তে বোনাস শেয়ার বা স্টক লভ্যাংশ প্রদান | অবিলম্বে প্রযোজ্য |
নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণ ও পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা
নতুন এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করেছে দেশের মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণকারী এই সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি আরও শক্তিশালী ও মজবুত করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ আর্থিক ঝুঁকি ও ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বা তা শোষণ করার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও স্পষ্ট করেছে যে, লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়ে এর আগে গত ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে জারি করা সার্কুলারের অন্যান্য সমস্ত নির্দেশনা ও শর্তাবলী যথারীতি বহাল থাকবে। উল্লেখ্য, এরও আগে গত ১৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লভ্যাংশ বিতরণের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা, খেলাপি ঋণের অনুপাত এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতাকে বিবেচনায় নেওয়ার নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় এবার পরিশোধিত মূলধনের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন সীমা আরোপ করা হলো।
