বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডলার–সংকট, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিকে অস্থির করে তোলে। কিছু ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে ঋণ প্রদান করায় তহবিলের সংকট আরও গভীর হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মনসুর দেড় বছরের মেয়াদে ব্যাংক খাতের ডলার ও টাকার সংকট অনেকটা সমাধান করেন।
Table of Contents
বিদায়ী গভর্নরের পদক্ষেপ ও প্রভাব
বিদায়ী গভর্নরের সময়ে পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নীতি সুদহার বৃদ্ধি করা হয়, যা ব্যাংক ঋণের সুদও বাড়িয়ে ব্যবসা–বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে কিছুটা শ্লথ করে। তবে ডলারের বাজারভিত্তিক মূল্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কমানো সম্ভব হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তীতে ৩৫ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। ডলারের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রয়েছে ১২২–১২৩ টাকার মধ্যে। খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
নতুন গভর্নরের প্রধান চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং বিভাগ সংস্কার ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা
সংকটে থাকা ব্যাংক একীভূত ও পুনর্গঠন করা
ব্যাংকিং নিয়মকানুন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা
খেলাপি ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করা
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা করা
নতুন অনিয়ম ও গোষ্ঠী সৃষ্টি রোধে কড়া নজরদারি
ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা
| বিষয় | আগস্ট ২০২৪ | ডিসেম্বর ২০২৫ (প্রায়) |
|---|---|---|
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলার) | ২৫.৯২ | ৩৫.০৪ |
| ডলারের বাজারমূল্য (টাকা) | ১২২–১২৩ | ১২২–১২৩ |
| খেলাপি ঋণের হার (%) | ১২.৫৬ | ৩৫.৭৩ |
| খেলাপি ঋণের পরিমাণ (কোটি টাকা) | প্রায় ২ লাখ | প্রায় ৬.৫ লাখ |
| একীভূত ব্যাংক সংখ্যা | ৫ | ৫ (চলমান প্রক্রিয়া) |
| বন্ধ হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান | ৬ (প্রক্রিয়াধীন) | ৬ (বাস্তবায়ন বাকি) |
বিশেষ মন্তব্য
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, “ব্যাংক সংস্কার শুরু হয়েছে কিন্তু সম্পূর্ণ হয়নি। নতুন গভর্নরকে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, একীভূত উদ্যোগ শেষ করা এবং খেলাপি ঋণ আদায় কার্যকর করতে হবে।”
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা বর্তমানে সাড়ে ৮ শতাংশে স্থিতিশীল। তবে বিনিয়োগ ও ব্যবসা–বাণিজ্য কিছুটা শ্লথ রয়েছে।
উপসংহার
সার্বিকভাবে, নতুন গভর্নরের দায়িত্ব শুধু ব্যাংক খাতের সংকট সামলানো নয়, বরং বিদ্যমান সংস্কারগুলো কার্যকর করে ব্যাংক খাতকে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং আইনি কাঠামো শক্তিশালী করাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য, যা নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে নির্ধারিত হবে।