বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে ২০২৬ সালের শুরুতেই অভাবনীয় জোয়ার দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি মাসের প্রথম ১০ দিনেই দেশে এসেছে ১১২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার, যা ১.১২ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থের প্রবাহ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে এই উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
পরিসংখ্যান ও বছর ব্যবধানের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রবিবার (১১ জানুয়ারি) প্রবাস আয়ের হালনাগাদ তথ্য প্রদান করেছেন। তথ্য অনুযায়ী, চলতি জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনে দৈনিক গড়ে দেশে এসেছে ১১ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪১ কোটি ডলার বা ৫৭ শতাংশ। একক দিন হিসেবে গত ১০ জানুয়ারি প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান মাইলফলক ও বর্তমান চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
এক নজরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও প্রবৃদ্ধির চিত্র
| বিবরণ | রেমিট্যান্সের পরিমাণ (মার্কিন ডলার) | উল্লেখযোগ্য মন্তব্য |
| জানুয়ারি ২০২৬ (প্রথম ১০ দিন) | ১১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার | দৈনিক গড় ১১.২৭ কোটি ডলার। |
| জানুয়ারি ২০২৫ (প্রথম ১০ দিন) | ৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলার | গত বছরের তুলনায় ব্যাপক প্রবৃদ্ধি। |
| ডিসেম্বর ২০২৫ (একক মাস) | ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার | ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক আয়। |
| চলতি অর্থবছর (জুলাই–১০ জানুয়ারি) | ১,৭৩৯ কোটি ২০ লাখ ডলার | বছর ব্যবধানে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। |
| ১০ জানুয়ারি (একক দিন) | ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার | প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীল ধারা। |
ডিসেম্বরের রেকর্ড ও অর্থবছরের সাফল্য
চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে বিদায়ী মাস ডিসেম্বর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওই মাসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার দেশে এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে কোনো একক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাস আয় এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুলাই থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট ১ হাজার ৭৩৯ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স প্রমাণ করে যে, প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী।
প্রবাহ বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাস আয়ের এই অভাবনীয় উল্লম্ফনের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে, ফলে হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্সের ওপর সরকারের দেওয়া আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা এবং ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রবাসীদের উৎসাহিত করছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজীকরণ প্রবাসীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
রেমিট্যান্সের এই উচ্চ গতি অব্যাহত থাকলে জানুয়ারি শেষে মোট প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
