বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শরিয়াভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি সরকারি বিল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালের শুরুতেই বাজারে আসতে পারে। এ লক্ষ্যে সরকার কীভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কাঠামো প্রস্তুত করছে।
গত ১১ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফাইন্যান্স ডিভিশনের অধীনস্থ ক্যাশ অ্যান্ড ডেট ম্যানেজমেন্ট কমিটি (CDMC) বৈঠকে এই বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি কোনো সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করতে না পারায় বাজারে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। নতুন এই বিল সেই শূন্যতা পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিলগুলোর মেয়াদ হবে তিন মাস, ছয় মাস ও এক বছর, যা আন্তর্জাতিক মানের শরিয়া-সম্মত মানি মার্কেট ইনস্ট্রুমেন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংগৃহীত অর্থ ব্যয় করা হবে সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে, যেন সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শরিয়া নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে।
শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে সম্প্রতি যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, এই বিল তা কাটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক সংকটে পড়ায় অনেক গ্রাহক সময়মতো টাকা তুলতে পারেননি, যার ফলে তাদের আস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। একীভূতকরণের পরও বহু গ্রাহকের অভিযোগ রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন শরিয়াভিত্তিক বিল এই আস্থাজনিত সংকট কাটাতে সহায়ক হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হুসাইন বলেন, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা রাখে; কিন্তু উপযুক্ত আর্থিক পণ্য না থাকায় তারা বিনিয়োগে পিছিয়ে ছিলেন। নতুন বিল চালু হলে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হবে।
অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলো সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক লাভ করেছে। উদাহরণ হিসেবে BRAC ব্যাংকের বিনিয়োগ আয়ের কথা উল্লেখযোগ্য—২০২৪ সালে তাদের বিনিয়োগ আয় দাঁড়ায় ২,৮৮০ কোটি টাকা, যা দুই বছর আগের তুলনায় প্রায় চার গুণ। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে নেট মুনাফা বেড়েছে ৫০%, যদিও একই সময়ে তাদের নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম কমেছে প্রায় ৭%।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, এমনকি সাধারণ নাগরিকরাও এসব শরিয়াভিত্তিক বিল কিনতে পারবেন। বাজারে এ ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বলেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য আগামী রমজানের আগেই বা রমজানেই এই বিল বাজারে আনা।
নতুন শরিয়াভিত্তিক বিল চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে আর্থিক পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
