আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের ঠিক আগমুহূর্তে নাটোরে চার কোটি টাকার একটি সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) আসনের বিএনপি প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিশাল অঙ্কের লেনদেনটি স্থগিত করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে এই অর্থ ব্যবহৃত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের বিবরণ
মঙ্গলবার বিকেলে নাটোর শহরের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, ঢাকা থেকে সোনালী ব্যাংক নাটোর শাখার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক নাটোর শাখার একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে প্রায় চার কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে এত বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের বিষয়টি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই অর্থ ভোট কেনাবেচা বা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত করার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
অবিলম্বে তিনি নাটোর জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে এই লেনদেন স্থগিত রাখার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানান। অভিযোগ পাওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত টাকা উত্তোলন বা লেনদেন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
ঘটনা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| পক্ষ/ব্যক্তি | পদবি | প্রধান বক্তব্য ও অবস্থান |
| রুহুল কুদ্দুস তালুকদার (দুলু) | প্রার্থী, নাটোর-২ (বিএনপি) | টাকাটি ভোট কেনাবেচায় ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। |
| আসমা শাহীন | জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা | প্রার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। |
| রেজাউল করিম | এভিপি, ইসলামী ব্যাংক নাটোর শাখা | টাকাটি এটিএম বুথের চাহিদা মেটানোর জন্য আনা হয়েছিল। |
| উজ্জল কুমার | এজিএম, সোনালী ব্যাংক নাটোর শাখা | ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে লেনদেনটি বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে। |
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা
ইসলামী ব্যাংক নাটোর শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) রেজাউল করিম লেনদেনটি স্বাভাবিক দাবি করে জানান, চার কোটি টাকা ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য খুব সাধারণ লেনদেন। সামনে নির্বাচনের কারণে ব্যাংক বন্ধ থাকবে, তাই গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে একটি নির্দিষ্ট এটিএম বুথের জন্য এই টাকার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা অসৎ উদ্দেশ্য নেই বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংক নাটোর প্রধান শাখার এজিএম উজ্জল কুমার জানান, একটি বড় অংকের লেনদেন নিয়ে অভিযোগ পাওয়ায় তারা দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বর্তমানে ওই টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবেই সংরক্ষিত রয়েছে, তবে তা উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
নির্বাচনের স্বচ্ছতা বনাম নিরাপত্তা
নাটোরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আসমা শাহীন জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময় যেকোনো বড় অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর নজর রাখা তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। যেহেতু একজন প্রার্থী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন, তাই জনমনে বিভ্রান্তি এড়াতে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে লেনদেনটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে ব্যাংক পাড়ায় এমন অস্থিরতা সাধারণ ভোটারদের মাঝেও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। নাটোর-২ আসনে নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, এই ঘটনাটি তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রশাসন কড়া নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে যাতে কোনো পক্ষই কালো টাকা ব্যবহার করে নির্বাচনী ফল পরিবর্তন করতে না পারে।
