প্রবাসী আয়ে শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক, দ্বিতীয় কৃষি ব্যাংক

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এখন এক অপরিহার্য শক্তির নাম। দীর্ঘদিনের ডলার–সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং আমদানি ব্যয়ের টানাপোড়েনের মধ্যে ২০২৫ সালে প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সদ্য সমাপ্ত বছরে রেমিট্যান্সের জোরালো প্রবাহের ফলে ডলারের সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে দেশের মাত্র তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমেই এসেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ রেমিট্যান্স, যা ব্যাংকিং খাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্ত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

প্রবাসী আয় আহরণে বরাবরের মতোই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। তবে এ বছর বড় চমক দেখিয়েছে সরকারি খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), যা দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৬২০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং অগ্রণী ব্যাংক এনেছে ২৭৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। এই তিন ব্যাংক মিলিয়ে মোট প্রবাসী আয়ের ৩৬ দশমিক ৯১ শতাংশ সংগ্রহ করেছে।

নিচের সারণিতে ২০২৫ সালে শীর্ষ কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে আসা প্রবাসী আয়ের চিত্র তুলে ধরা হলো—

ব্যাংকের নামপ্রবাসী আয় (কোটি ডলার)মোট আয়ের অংশ (%)
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ৬২০.৪০
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক৩১২.৭০
অগ্রণী ব্যাংক২৭৮.২০
জনতা ব্যাংক২২৫.৭০
ব্র্যাক ব্যাংক২১৭.১০
ট্রাস্ট ব্যাংক১৮১.৬০
সোনালী ব্যাংক১৫১.৩০
রূপালী ব্যাংক১২১.৫০
সিটি ব্যাংক৯৫.১০
ব্যাংক এশিয়া৮৪.৮০

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ তীব্র ডলার–সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এর ফলে জ্বালানি তেল, সার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রবাসী আয়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়। ওই মাসে ৩২৯ কোটি ডলার দেশে আসে, যা একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স হিসেবে বিবেচিত। পরে ডিসেম্বর মাসেও প্রবাসী আয় ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকার ইঙ্গিত দেয়।

ব্যাংক খাতের কর্মকর্তাদের মতে, অর্থ পাচার কমে আসায় অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল থাকায় প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। সরকারের আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে ব্যাংকের আন্তসংযোগ প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০২৫ সালে প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে বড় অবদান রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে দেশের রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Comment