প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক সংস্কারে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান

অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি তার উত্তরসূরি ও সরকারের জন্য একটি বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য বিস্তৃত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। প্রস্তাবনার মূল অংশে তিনি একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধান করবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণের মূল কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেছেন, এই কাঠামোগত পরিবর্তন স্বার্থের সংঘাত কমাবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করবে এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বৈত দায়িত্ব পালন করছে: একদিকে এটি নীতি প্রণয়ন করছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান তত্ত্বাবধান করছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করেছেন যে নীতি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা একক সংস্থার মধ্যে থাকা কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা উভয়কেই প্রভাবিত করতে পারে।

আহমেদ প্রস্তাব করেছেন, একটি বিশেষায়িত তত্ত্বাবধান সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা কেবল তত্ত্বাবধানে মনোনিবেশ করবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মূল দায়িত্ব যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে আরও মনোযোগ দিতে পারবে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দেশের তুলনামূলকভাবে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে, তাই তত্ত্বাবধান কার্যক্রম আলাদা করা অপরিহার্য।

নির্বাচিত দেশের ব্যাংক তত্ত্বাবধান কাঠামো

দেশতত্ত্বাবধান কাঠামো
যুক্তরাষ্ট্রস্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর
যুক্তরাজ্যস্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক কার্যকর
জাপানপৃথক তত্ত্বাবধান সংস্থা বিদ্যমান
ভারতকেন্দ্রীয় ব্যাংকও তত্ত্বাবধান করে
ফিলিপাইনকেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে

প্রস্তাবনায় একটি ব্যাংক পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষ, আমানত বীমা সংস্থা এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং শারিয়াহ সম্মত ব্যাংকিংয়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রাথমিক অগ্রাধিকার

আহমেদ সরকারের জন্য কয়েকটি তাত্ক্ষণিক অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন:

  1. রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করা

  2. বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা

  3. গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া

  4. উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন

  5. ভর্তুকিভুক্ত বেতন কাঠামো পুনর্গঠন ও অপচয় হ্রাস

তিনি উল্লেখ করেছেন, গত দশকে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য করেছে। এছাড়া সমন্বিত রাজস্ব ও আর্থিক নীতির গুরুত্বও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি কর এড়ানো, অতিরিক্ত ছাড় এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব চিহ্নিত করেছেন। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছেন।

সারসংক্ষেপে, আহমেদ বলেছেন যে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্ভব। তার সুপারিশগুলো আসন্ন সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হবে।

এভাবে, সালেহউদ্দিন আহমেদের সুপারিশ এক সংবদ্ধ, বাস্তবমুখী এবং সময়োপযোগী আর্থিক সংস্কারের রূপরেখা প্রদান করেছে।

Leave a Comment