প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা

দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার ব্যাংক সম্প্রতি আমানত তুলে নেওয়ার চাপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা লাভ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গত সপ্তাহে এই অর্থ অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এই বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হয়।

তারল্য সহায়তার প্রকৃতি ও এসএলআর সমন্বয়

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ৫ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হলেও, এর একটি বড় অংশ ব্যাংকটির আইনি বাধ্যবাধকতা মেটাতে ব্যয় হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকাই কেটে নেওয়া হয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ‘সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত’ বা এসএলআর (Statutory Liquidity Ratio) এর ঘাটতি পূরণের জন্য।

সাধারণত প্রচলিত ধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ নগদ অর্থ, স্বর্ণ বা সরকারি সিকিউরিটিজ আকারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। বর্তমানে এই হার ১৩ শতাংশ। প্রিমিয়ার ব্যাংক এই ন্যূনতম হার বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বিশেষ এই তারল্য সহায়তা থেকে আগে সেই আইনি ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান তারল্য পরিস্থিতির রূপরেখা:

বিষয়বিবরণ ও পরিমাণ
মোট তারল্য সহায়তা৫,০০০ কোটি টাকা।
এসএলআর ঘাটতি সমন্বয়৪,০০০ কোটি টাকা (প্রায়)।
কার্যকর ব্যবহারযোগ্য অর্থ১,০০০ কোটি টাকা (প্রায়)।
বিদ্যমান এসএলআর হার১৩ শতাংশ (বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য)।
পর্ষদ পুনর্গঠনকালআগস্ট, ২০২৫ (সাত সদস্যের পর্ষদ)।

নেতৃত্ব ও পর্ষদ পুনর্গঠন

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাত সদস্যের একটি নতুন প্যানেল গঠন করে। এর আগে ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান এবং সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এইচবিএম ইকবাল গত বছরের জানুয়ারি মাসে পদত্যাগ করেন। তিনি টানা ২৬ বছর ব্যাংকটির শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন। বর্তমানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. মনজুর মফিজ। সাম্প্রতিক এই তারল্য সংকটের বিষয়ে তার মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে বা খুদে বার্তায় পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পথচলা

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংকের এসএলআর ঘাটতি থাকা মানেই হলো ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া এই ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকটিকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও, আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোই হবে নতুন পর্ষদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকটিকে এখন দীর্ঘমেয়াদী আমানত আকৃষ্ট করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী করার দিকে নজর দিতে হবে।

Leave a Comment