প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি-এর নারায়ণগঞ্জ শাখার মাধ্যমে গ্রাহকদের অজান্তে শত শত কোটি টাকার ভুয়া ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এই জালিয়াতির প্রতিকার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে দাবি জানিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ফোরাম বা ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী কারখানার মালিকেরা এই তথ্য প্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের কার্যকালে এই আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি সংঘটিত হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।
জালিয়াতির কৌশল ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
সংবাদ সম্মেলনে ডোয়াস ল্যান্ড অ্যাপারেলসের স্বত্বাধিকারী আরিফুর রহমান একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি জানান, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও তৎকালীন চেয়ারম্যানের যোগসাজশে শাখা ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তারা গ্রাহকদের কোনো প্রকার সম্মতি ছাড়াই ভুয়া ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট খুলে বিপুল পরিমাণ দায় সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে এই কৃত্রিম দায়গুলোকে গ্রাহকদের নামে ঋণে রূপান্তরিত করা হয়।
স্বাভাবিক নিয়মে কোনো প্রতিষ্ঠান ১ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করলে তারা সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হয়। কিন্তু এই জালিয়াতির মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ কোটি টাকার বিপরীতে সাড়ে ৭ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণপত্র খোলা হয়েছে। সাধারণত রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে এই ঋণপত্রের দায় পরিশোধ করার কথা থাকলেও, এখানে প্রিমিয়ার এক্সচেঞ্জ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে দায় সমন্বয় করা হয় এবং তা গ্রাহকের নামে ঋণ হিসেবে দেখানো হয়। এই অনিয়মের ফলে নারায়ণগঞ্জ শাখার মোট ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঋণ তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৬টিই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা। এই কারখানাগুলোতে একসময় ২৮ থেকে ৩০ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন, যা এখন জালিয়াতির কারণে বন্ধের মুখে পড়েছে।
জালিয়াতির শিকার একটি কারখানার আর্থিক চিত্র এবং সামগ্রিক পরিসংখ্যান
নিচে সারণির মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার এই কথিত জালিয়াতির কাঠামোগত এবং একটি নির্দিষ্ট কারখানার পরিসংখ্যানগত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
সারণি ১: জালিয়াতির শিকার ‘টোটাল ফ্যাশন’ কারখানার হিসাব বিবরণী
| বিবরণী | অনুমোদিত ও ব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ (টাকা) | জালিয়াতির পর প্রদর্শিত দায় (টাকা) |
| ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণের সর্বোচ্চ সীমা | ৫০ কোটি | — |
| কারখানা কর্তৃক প্রকৃতপক্ষে উত্তোলিত ঋণ | ৪৮ কোটি | — |
| ২০২৩ সালে ভুয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে প্রদর্শিত মোট দায় | — | ৩৬০ কোটি |
সারণি ২: সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবসম্পদ খতিয়ান
| সূচক বা খাত | সংশ্লিষ্ট সংখ্যা ও বিবরণ |
| নারায়ণগঞ্জ শাখায় ভুক্তভোগী মোট প্রতিষ্ঠান | ৪৩টি |
| তদন্তের দাবি জানানো রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা | ২৬টি |
| কারখানাসমূহে নিয়োজিত পূর্বতন শ্রমিকের সংখ্যা | ২৮,০০০ থেকে ৩০,০০০ জন |
| কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রেরিত অভিযোগ পত্রের সংখ্যা | ২২টি |
প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা ও চলমান তদন্ত কার্যক্রম
ভুক্তভোগী উদ্যোক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন যে, ব্যাংকের নিজস্ব প্রধান কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা দলের নজর এড়িয়ে কীভাবে এত বড় পরিধির আর্থিক জালিয়াতি বছরের পর বছর ধরে চলতে পারল। তারা জানান, এই বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিগত দিনে ২২টি চিঠি পাঠানো হলেও কোনো সুরাহা মেলেনি। এমনকি উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রিমিয়ার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো গ্রাহকের নামে কত টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব বিবরণী প্রকাশ করেনি। ব্যবসায়ী মালিকেরা অবিলম্বে এই জালিয়াতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ভুয়া দায়সমূহ বাতিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো সচল করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের সকল প্রকার অনিয়ম খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা সংস্থা ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’ এবং স্থানীয় ছয়টি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানকে ফরেনসিক বা আইনগত নিরীক্ষার দায়িত্ব প্রদান করেছে। এর অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ শাখার বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র বহিরাগত নিরীক্ষা সংস্থাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন যে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে এই সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অভিযুক্ত ২৬টি পোশাক কারখানার অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত প্রতিবেদন তলব করেছে।
