বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা রাশেদুল ইসলাম এখন সোনালী ব্যাংক জিয়া পরিষদের সভাপতি

সোনালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম জেনারেল ম্যানেজারের অফিস (জিএমও) ঘিরে তুমুল আলোচনা চলছে। রাশেদুল ইসলাম, যিনি দীর্ঘদিন আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এখন বিএনপিপন্থি সংগঠন সোনালী ব্যাংক জিয়া পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি হয়েছেন। এই পদোন্নতির খবর পেয়ে ব্যাংকের বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও এমপ্লয়িজ ইউনিয়নে রাশেদুল ইসলামের পরিচিতি

আগে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ এবং আওয়ামী লীগের শ্রমিক সংগঠন সোনালী ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সক্রিয় নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীসহ দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। অভিযোগ আছে, জিএমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তিনি অফিস, বাসা ও নানা সুযোগ-সুবিধা নিতেন।

তবে ৫ আগস্টের পর হঠাৎ তার রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংক জিয়া পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়েছে।

দীর্ঘকালীন প্রশাসনিক প্রভাব

অভিযোগ রয়েছে, রাশেদুল ইসলাম জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে ব্যাংকের প্রশাসনিক বিষয়গুলো নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। ব্যাংক নীতিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি থাকা নিষিদ্ধ, তবুও তিনি টানা এক যুগ চট্টগ্রাম জিএমও (উত্তর ও দক্ষিণ) অফিসে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উত্তরে এবং পরে বদলি হলেও দক্ষিণ জিএমও অফিসে কাজ করেছেন।

স্টাফ কলোনি ও বাসা ব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে নগরের মা ও শিশু হাসপাতালের পেছনে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলোনির ‘এ’ ভবনের একটি কোয়ার্টারে অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন। মে মাসে তিনি অফিসার্স কলোনির ‘সি’ ভবনে উঠলেও এটি বরাদ্দ হয় সনেট মল্লিকের নামে। এছাড়া কলোনির আঙিনার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

কিছু কর্মকর্তার দাবি, রাশেদুল ইসলাম জিএম ও সিবিএ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের মাধ্যমে বাসা, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা নিতেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে কোয়ার্টারে ভাড়া ছাড়াই বসবাসের অভিযোগও রয়েছে।

জিয়া পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা কমিটি

গত ২১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংক জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সুভাষ চন্দ্র চাকমা এবং সাধারণ সম্পাদক এসএম আবুল বাশার নতুন চট্টগ্রাম জেলা কমিটি অনুমোদন দেন।

৩৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে:

  • সভাপতি হন রাশেদুল ইসলাম
  • সাধারণ সম্পাদক মো. নুর উদ্দিন চৌধুরী

বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, পুরো কমিটিতেই আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠরা রয়েছেন।

পদত্যাগ ও বিতর্ক

চট্টগ্রামের চারজন জিয়া পরিষদ কর্মকর্তা—মঞ্জুর মোর্শেদ, আব্দুর রউফ, আলমগীর মো. নোমান চৌধুরী এবং কাওসার জোহরা—পদত্যাগ করেছেন, কারণ তারা বলেন, কোনো আলাপ না করেই কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে।

আওয়ামীপন্থি সোনালী ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের এক নেতা বলেন, “রাশেদুল ইসলাম আমাদের সংগঠনেরই সদস্য ছিলেন। প্রেস রিলিজ লিখতেন, সব অনুষ্ঠানে থাকতেন। আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা ভোগ করতেন। এখন তিনি কীভাবে জিয়া পরিষদের সভাপতি হলেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাশেদুল ব্যাংকের হাউস বিল্ডিং লোন প্রকল্পে জমি পরিদর্শনের সনদ দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতেন।

রাশেদুল ইসলামের প্রতিক্রিয়া

রাশেদুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। কোনো প্রমাণ নেই। জিএমের নির্দেশে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠানগুলোতে ছবি তুলেছি। কলোনির কোনো আঙিনা ভাড়া দেইনি।”

তবে বাসা দখলের অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, “আমি জিএমের মাধ্যমে কিছুদিন স্টাফ কলোনিতে ছিলাম। বর্তমানে সনেট মল্লিকের নামে বরাদ্দ বাসায় থাকছি। কিছুদিন পর বাসাটি ছাড়ব। হাউস বিল্ডিং লোন গ্রহণের জন্য বাসা পাইনি।”

ব্যাংকের জিএমও দক্ষিণের প্রতিক্রিয়া

সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মশিউর রহমান বলেন, “স্টাফ কলোনিতে কেউ থাকার কথা নয়। বিষয়টি তদন্ত করা হবে। প্রমাণ মিললে বাসা বাতিল করা হবে। কলোনির মাঠ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।”

রাশেদুল ইসলামের পদোন্নতি এবং তার বিরুদ্ধে থাকা বিতর্ক সোনালী ব্যাংকের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরকে কেন্দ্র করে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Leave a Comment