বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঋণের গুণগত মান, সুশাসন ও স্বচ্ছতা জোরদারের লক্ষ্যে বড় অঙ্কের ঋণের ওপর আরও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধকী সম্পদের অতিমূল্যায়ন, জাল দলিল ও অনিয়মিত নথিপত্রের কারণে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচশ কোটি টাকার বেশি ঋণকে এই বিশেষ তদারকির আওতায় আনা হবে, যা ঐতিহাসিকভাবে অনিয়মের ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে পরিচিত।
সোমবার জানুয়ারি–জুন মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর এই পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান নীতিগত অবস্থান দ্রুত ঋণ সম্প্রসারণের চেয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। শিগগিরই একটি নির্দেশনা জারি করা হবে, যার মাধ্যমে বড় ঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শক দল সরাসরি মাঠপর্যায়ে গিয়ে যাচাই করবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে রাখা বন্ধকী সম্পদ বাস্তবে বিদ্যমান কি না, তার মালিকানা দলিল সঠিক কি না এবং বাজারদরের সঙ্গে ঘোষিত মূল্য সঙ্গতিপূর্ণ কি না—সবকিছু সরেজমিনে পরীক্ষা করা হবে। ভূমির দলিল, নামজারি, নিবন্ধন ও বন্ধক সংক্রান্ত নথিতে কারসাজির সুযোগ কমাতে এই পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। অতীতে এ ধরনের অনিয়মই খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গভর্নর জানান, জাল দলিল শনাক্তে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজের কারিগরি সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ভূমি রেকর্ড, নিবন্ধন ব্যবস্থা ও সহায়ক কাগজপত্র বিশ্লেষণে প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা হচ্ছে। এরই মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন শুরু করেছে। বিশেষ করে এক হাজার কোটি থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাবে ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সম্পদ যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে অতিমাত্রায় ঋণ প্রবৃদ্ধির সংস্কৃতি থেকে সরে এসে দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনার দিকে ধীরে ধীরে মানসিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
আইনগত সংস্কারের প্রসঙ্গে ড. মনসুর জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন না দেওয়ায় তিনি হতাশ। ১৯৭২ সালের আদেশ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহি ও সুশাসন জোরদার করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই সংশোধনী পুনরায় উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়টিও এখনও ঝুলে আছে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক পুনর্গঠন কাঠামোসহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং বাস্তবায়ন চলছে, যা আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। গভর্নর আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য স্থায়ী আইনগত সুরক্ষা একটি স্বীকৃত মানদণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এটি অপরিহার্য। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে যেখানে স্বল্পমেয়াদি লাভ প্রাধান্য পায়, সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা—এই নীতিতেই তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান।
প্রস্তাবিত বড় ঋণ তদারকি কাঠামোর মূল দিকসমূহ
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঋণের সীমা | পাঁচশ কোটি টাকার বেশি |
| তদারকি কর্তৃপক্ষ | বাংলাদেশ ব্যাংকের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শক দল |
| যাচাইয়ের ক্ষেত্র | বন্ধকী সম্পদের মূল্য, দলিলের সত্যতা, সম্পদের অস্তিত্ব |
| মূল লক্ষ্য | অতিমূল্যায়ন ও জাল নথি প্রতিরোধ |
| নীতিগত গুরুত্ব | ঋণের মান, সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা |
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে বড় অঙ্কের ঋণে আস্থা পুনর্গঠনের পথে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
