২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সমান।
গত বছরের জুনে বিদেশি ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমে ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়নে নেমেছিল। অর্থাৎ, জুনের তুলনায় ঋণ সামান্য কমলেও সেপ্টেম্বরের পরিমাণের চেয়ে ডিসেম্বরের শেষ প্রান্তিকে ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঋণের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ।
বৈদেশিক ঋণের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ
| খাত | ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন ডলার) | শতকরা হার (%) |
|---|---|---|
| সরকারি খাত | ৯৩.৪৬ | ৮২.৪ |
| বেসরকারি খাত | ২০.০৫ | ১৭.৬ |
| মোট | ১১৩.৫১ | ১০০ |
মোট ঋণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৮৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, স্বল্পমেয়াদি ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সরকারি খাতে সরাসরি সরকার নিয়েছে ৮০ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার, এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নিয়েছে ১২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণে অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন প্রান্তিকে ধারাবাহিকভাবে কমলেও শেষ প্রান্তিকে ঋণ আবার ২০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এই খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১০ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বাণিজ্যিক ঋণ ৬ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ স্থিতি ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।
ঋণ বৃদ্ধির কারণ ও অর্থনীতি প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডলার–সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারও ঋণ নিয়েছিল। এসব প্রকল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত না হওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। সরকার ও বেসরকারি খাত প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে ঋণ শোধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারিতে নতুন বৈদেশিক ঋণ এসেছে ২৬৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার, কিন্তু একই সময়ে ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার শোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরেও ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ছিল।
২০২২ সালের রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডলারের মূল্য ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকায় পৌঁছায়। এতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সরকারের পদক্ষেপে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজার্ভের পতন রোধ করা সম্ভব হয় এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়।
ঋণের দীর্ঘমেয়াদি ধারা
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বৈদেশিক ঋণ ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, ২০০৮ সালে বেড়ে ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়নে পৌঁছায়। এরপর ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ডলার–সংকট মেটাতে ঋণ গ্রহণ করে, যার ফলে ২০২৫ সালে ঋণ ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বৈদেশিক ঋণের এই বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়কে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
এই রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশকে নীতিগতভাবে ঋণ শোধ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
