ঢাকা, ৪ নভেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) কাছে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানি, টেলিকম অপারেটর, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীসহ মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা দিয়েছে।
এই পদক্ষেপ এসেছে এমন এক সময়ে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের সীমা ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে, যাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়।
Table of Contents
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকসমূহ
বিভিন্ন আবেদনকারীর মধ্যে রয়েছে বিদেশি অংশীদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবনী ফিনটেক উদ্যোগও। নিচে ১৩টি আবেদনকারীর তালিকা ও তাদের প্রস্তাবিত ব্যাংকের নাম দেওয়া হলো —
| প্রতিষ্ঠান / অংশীদারিত্ব | প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের নাম |
|---|---|
| বিকাশ লিমিটেড | বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক |
| ভিয়ন (বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান) ও স্কয়ার গ্রুপ | নোভা ডিজিটাল ব্যাংক |
| রবি আজিয়াটা লিমিটেড | বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক |
| আকিজ রিসোর্স গ্রুপ | মুনাফা ইসলামি ডিজিটাল ব্যাংক |
| ডিবিএল গ্রুপ ও জাপান রেমিট ফাইন্যান্স | জাপান-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক |
| ব্রিটিশ বাংলা গ্রুপ | ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি |
| ডিকে ব্যাংক ও ভুটানিজ অংশীদার | ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান |
| ২২টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম | আমার ডিজিটাল ব্যাংক |
| ১৬ জন উদ্যোক্তার যৌথ উদ্যোগ | ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি |
| এনজিও কনসোর্টিয়াম | আমার ব্যাংক |
| যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিনিয়োগকারী | অ্যাপ ব্যাংক |
| আশা মাইক্রোফাইন্যান্স | মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি |
| আইটি সল্যুশনস লিমিটেড | উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক |
সম্পূর্ণ অ্যাপ-ভিত্তিক নতুন ব্যাংকিং যুগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের ডিজিটাল ব্যাংক ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকগুলো হবে সম্পূর্ণ অনলাইন ও শাখাহীন। সমস্ত ব্যাংকিং কার্যক্রম — যেমন টাকা জমা, উত্তোলন, ঋণ আবেদন, কাস্টমার সার্ভিস ও বিল পরিশোধ — পরিচালিত হবে মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
গ্রাহকরা ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন সেবা পাবেন। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান প্রদান করবে; তবে তারা ফিজিক্যাল কার্ড ইস্যু করতে পারবে না।
এছাড়া, এই ব্যাংকগুলো মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে ঋণ প্রদান করতে পারবে না, বরং ক্ষুদ্রঋণ, খুচরা ব্যাংকিং, ও নিম্নআয়ের গ্রাহকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দেবে। গ্রাহকরা অন্য ব্যাংকের এটিএম বা এজেন্ট ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন ও জমা দিতে পারবেন।
শিল্পপ্রতিনিধিদের মন্তব্য ও কৌশলগত লক্ষ্য
ভিয়ন, যা বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান, তাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছে যে তারা বর্তমানে পাকিস্তান, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানে ৪ কোটি ৭ লক্ষাধিক ব্যবহারকারীকে ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রদান করছে।
ভিয়নের গ্রুপ সিইও কান তেরজিওগ্লু বলেন:
“ভিয়ন প্রতিটি দেশে টেলিকম ও ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্লাউডভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।”
আকিজ রিসোর্স গ্রুপের চিফ ডিজিটাল ও ইনোভেশন অফিসার মো. ফিরোজ কবির বলেন:
“আমাদের ডিজিটাল ব্যাংক উদ্যোগ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৩০ ভিশন’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যবহারকারীরা লেনদেনবিহীন চার্জে স্বচ্ছ, নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাবেন।”
নীতিগত প্রেক্ষাপট ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা (গাইডলাইন) অনুমোদন করে, যার লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া।
ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারে আইপিও আনতে হবে, যার পরিমাণ স্পন্সরদের মূলধনের সমান বা তার বেশি হতে হবে।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে অনুমোদন দিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই অনুমোদন স্থগিত করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে আবেদন আহ্বান করে এবং শেষ সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
ডিজিটাল রূপান্তরের পথে বাংলাদেশ
অর্থনীতিবিদ ও ফিনটেক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যেখানে এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ব্যাংকবহির্ভূত।
টেলিকমের নাগাল, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেলের সমন্বয়ে এই নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ন্যূনতম মূলধন ৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে বড় করপোরেট ও বিদেশি অংশীদারদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হতে পারে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাইলট কার্যক্রম শুরু করতে পারে, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে এক সম্পূর্ণ ডিজিটাল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যতমুখী রূপে রূপান্তর করবে।